কাজে আসছে না শতকোটি টাকার মনু প্রকল্প

সরজমিন কাউয়াদিঘি হাওর

কাজে আসছে না শতকোটি টাকার মনু প্রকল্প

ফন্ট সাইজ:

৩৫ কোটি টাকার দুর্নীতির পর আলোচনায় ছিল কাশিমপুর পাম্প হাউজ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে (২০১৬-২০১৮) আধুনিকায়ন ও সংস্কারের নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিগমা ইঞ্জিনিয়ারস লিমিটেড ও অন্যান্য সহযোগীরা মিলে সেচ পাম্প ক্রয় বাবত এই পুকুরচুরি দুর্নীতির কারণে দুদক মামলা করে। মনুপ্রকল্প ও কাশিমপুর পাম্প হাউজের সংস্কারের নামে আর্থিক দুর্নীতিতে ব্যক্তি বিশেষের ভাগ্য পরিবর্তন হলেও কৃষকরা যেই সেই। কাঙ্ক্ষিত সংস্কার ও উন্নয়ন নেই মনুপ্রকল্প ও সেচ পাম্পের। শতকোটি টাকার মনুপ্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউজটি কার স্বার্থে। এখন এমন প্রশ্ন তুলছেন এই প্রকল্পের আওতাধীন স্থানীয় উপকারভোগী কৃষকরা।

কৃষি ও কৃষকের কল্যাণের এই প্রকল্পটি এখন যেন কৃষকের ফসল ডুবিয়ে ভাতে মারার ফাঁদ। এখন হাওর জুড়ে কেবল সারা বছরের একমাত্র সম্বল বোরোধান হারানো কৃষকের কান্না আর আহাজারি। ঋণ নিয়ে বর্গা চাষ করে একমুঠো বোরোধান গোলায় না তোলা ও গোখাদ্য না পাওয়ার বেদনায় চলছে বিলাপ। হাকালুকি, কাউয়াদিঘি ও হাইল হাওর। একই অবস্থা জেলার হাওর পাড়ের বোরো চাষিদের। কিন্তু জেলার অন্যান্য হাওরের মতো কাউয়াদিঘি হাওরের বোরো চাষিদের এমন দুর্ভোগে পড়ার কথা ছিল না। কারণ কাউয়াদিঘি হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে রয়েছে শতকোটি টাকার প্রকল্প। হাওর তীরে রয়েছে ৯টি সেচ পাম্পের কাশিমপুর পাম্প হাউজ। কিন্তু নানা অজুহাতে প্রয়োজনের সময়ে সচল থাকে না বিশাল ব্যয়ের কৃষকের কল্যাণের এই পাম্প হাউজটি।

তাই দু’মৌসুমেই এই পাম্প হাউজ থেকে কোনো উপকারই পাচ্ছে না হাওর পাড়ের কৃষকরা। সরজমিন কাউয়াদিঘি হাওর এলাকায় গেলে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকরা ক্ষোভের সঙ্গে এমনটিই জানান। চাষিরা বলেন- কৃষকদের কল্যাণে শতকোটি টাকার প্রকল্প থাকার পরও প্রতিবছরই প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে আমাদের। এমনটি না হওয়ার জন্য সরকার প্রতিবছরই ওই প্রকল্প আর সেচ পাম্পের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু কি কল্যাণ হচ্ছে কৃষকদের। অন্যান্য হাওরের মতো আমাদের হাওরের বোরো ফসল হারানোর কোনো কারণই ছিল না। কিন্তু সময়মতো পাম্প হাউজটি সচল না থাকায় বোরো হারিয়ে আজ আমরা দিশাহারা। এটা আমাদের নিয়তি নয়। আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের চরম উদাসীনতায় আজ আমরা পথে বসেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে আগে (বর্তমান মনুনদী প্রকল্পের আওতাধীন) ওই এলাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা ও খরায় কৃষকদের চাষকৃত ফসল ঘরে তোলা সম্ভব হতো না। প্রকল্প এলাকার অধিকাংশ কৃষি জমিই নিচু। এর মধ্যে ৪৮৫৮ হেক্টর কৃষি জমি অতি নিচু হওয়ায় ৪ থেকে ৬ মিটার গভীর পানিতে ডুবে থাকে।

অথচ ওই এলাকার প্রধান ফসলই ধান। কিন্তু জলাবদ্ধতা ও খরায় ব্যাহত হতো উৎপাদন। ওই এলাকায় ১১২০০ হেক্টরে দু’টি, ৩৯০০ হেক্টরে একটি এবং ৪০ হেক্টরে তিনটি ফসল উৎপাদন হতো। ফসলের নিবিড়তা ছিল ১২৬ শতাংশ। চাষিরা মনুপ্রকল্পের আগে প্রকৃতির খেয়ালের উপরই কৃষি ব্যবস্থা ও চাষ পদ্ধতি নির্ধারণ করেছিলেন। চাষিদের এমন দুর্দশা লাঘবে কৃষক, কৃষিজমি ও ফসল রক্ষার উন্নয়নের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হন। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ১৯৬২ সালের রিপোর্টের ভিত্তিতে এই প্রকল্পের বিস্তারিত রিপোর্ট ১৯৭২ সালে প্রণয়ন করা হয়। এর ভিত্তিতে প্রকল্পের নাম দেয়া হয় মনুপ্রকল্প। প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ১৯৭৫-৭৬ সালে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৮২-৮৩ সালে। জানা যায় মনুপ্রকল্পের প্রকল্প এলাকা ২২,৬৭২ হেক্টর, কৃষিজমি ১৯,২৭৮ হেক্টর, নিট ১৫,৫৪৬ হেক্টর, সেচ ব্যবস্থাধীন জমি ১১,৫৭৮ হেক্টর। বাঁধ ৫৯ কিলোমিটার। সেচ খাল ১০৫টি। ব্যারেজ ১টি, পাম্পিং প্যান্ট ১টি। নিষ্কাশন সাইফুন সুইচ ৭টি, নিষ্কাশন সাইফুন ৯টি। অন্যান্য স্ট্রাকচার ৩০৯টি।

তৎকালীন নির্মাণ ব্যয় ৬৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। আর প্রকল্পটির বার্ষিক পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হয় ১২১.৫০ লাখ টাকা। প্রথম দিকে চাষিরা এই প্রকল্পের সুফল পেলেও এখন বিপরীত চিত্র। এতো বিশাল বাজেট ও বার্ষিক ব্যয়ের প্রকল্পটি এখন ন্যূনতম উপকারে আসছে না কৃষকদের। কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন- বর্ষা মৌসুমে নানা অজুহাতে সেচ না দিয়ে পাম্প বন্ধ রাখাতে পানিতে তলিয়ে যায় বোরোধান। আর শুকনো মৌসুমে বোরোসহ অন্যান্য ফসল চাষের জন্য পানির প্রয়োজনের সময় হাওরের বিল মালিকদের সঙ্গে আঁতাত করে উৎকোচের বিনিময়ে সেচ দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ করে দেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা।

এতে করে দু’মৌসুমেই ক্ষতিগ্রস্ত হন তারা। পানি উন্নয়ন বোর্ড মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলিদ মানবজমিনকে জানান- ভারী বৃষ্টির সময় পাম্পের নিষ্কাশন ক্ষমতার চেয়ে কয়েকগুণ পানি বিভিন্ন ছড়া দিয়ে প্রকল্পের ভেতর প্রবেশ করে। তখন তা সেচ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ বছর এপ্রিল ও মে মাসের প্রথম দিকে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় তা সেচ দিয়েও নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এই প্রকল্পটির সুফল পেতে সঠিক পরিকল্পনা, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রয়োজন।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন