স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও সরকারি সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এখনো থ্যালাসিমিয়ার চিকিৎসার সুযোগ না থাকা দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়কমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, এটা সত্যিকার অর্থেই খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, আমাদের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে, এখন পর্যন্ত থ্যালাসিমিয়া রোগীর সরকারিভাবে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মেডিকেল কলেজে আমরা সেই সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি নাই প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ বাদই দেই।
শুক্রবার মালিবাগস্থ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ^ থ্যালাসিমিয়া দিবস পালন উপলক্ষে সংগঠনটি এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে রাজধানীতে বের করা হয় একটি বর্ণাঢ্য র্যালিও।
বাংলাদেশ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মনজুর মোরশেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ, বিএমইউ’র প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।
আয়োজকরা জানান, দেশে প্রতিবছর ৮ থেকে ১১ হাজার শিশু থ্যালাসিমিয়া রোগ নিয়ে জন্ম গ্রহণ করছে। বিবিএস’র এক জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রতি ৯ জনের মধ্যে ১ জন থ্যালাসিমিয়া রোগের বাহক রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, এটাই প্রকৃত সত্য। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, আমরা পারিনি। এটা স্বীকার করতে নিজের মধ্যে কোনো ধরনের দ্বীনতা থাকা উচিত নয়। এটাকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেয়া, সেটা যেকোনো কারণেই হোক, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা—যেকোনো সীমাবদ্ধতাই এগুলো কাজ করেছে। তার জন্যই হয়তো আমরা পারি নাই।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, আমরা আশ্বস্ত করতে চাই যে, বর্তমান সরকার দেশের সকল মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অর্থাৎ, অর্থের অভাবে চিকিৎসা হবে না, বাংলাদেশে এই চিত্র বর্তমান সরকার রাখতে চায় না।
এই চিকিৎসক বলেন, থ্যালাসিমিয়ার সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রতিরোধ। এটা দিন দিন বাড়ছে। এটা এমন একটা অসুখ, অসুস্থ হয়ে গেলে চিকিৎসা নিতে থাকতে হবে।
অনেক দেশে (থ্যালাসিমিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা) কমে গেছে, এটা কিন্তু চিকিৎসার কারণে কমে নাই জনসচেতনতার কারণে কমেছে। থ্যালাসিমিয়ার বাহক যদি স্বামী-স্ত্রী হয়, বাচ্চার থ্যালাসিমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। হবেই তা না, বেড়ে যাবে এবং বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকবে।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, আমরা জানি না বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে কারা থ্যালাসিমিয়ার বাহক বা থ্যালাসিমিয়ার ট্রেইট।
থ্যালাসিমিয়া প্রতিরোধে গাইডলাইনের প্রয়োজনীয়তার তুলে ধরে জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের যদি গাইডলাইনটা করা থাকতো যে, আমাদের দেশে বিয়ে হতে হলে পাত্র ও পাত্রীর রক্তের কিছু কিছু পরীক্ষা অবশ্যই করণীয়। এটা করতে গেলে আমাদের দেশে অনেক বাধা-বিপত্তি, বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনুশাসন, সবচেয়ে বড় জিনিস মূর্খতা যার জন্য মানুষের মধ্যে কুসংস্কার আসে। এই কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে হলে সামাজিক আন্দোলন দরকার।
তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশে অন্তত ৬৪টি জেলায় এবং অনেক উপজেলায় রক্তের অনেক পরীক্ষা করানোর সুযোগ আছে। কেবল উদ্যোগের অভাব আছে। মানুষকে যদি উদ্বুদ্ধ করা যায়, মানুষ কিন্তু রাজি হবে। সেই সঙ্গে আইনের গুরুত্বও তুলে ধরেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী।
তিনি বলেন, বিয়ে হবে, বিয়ে তো বন্ধ থাকবে না! কিন্তু বিয়ের পরে একটি অসুস্থ বাচ্চা যেটা (থ্যালাসিমিয়া) সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে কষ্টকরভাবে এবং যেটার জন্য প্রচুর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা থাকবে, কাজেই সেটার চেয়ে (বিয়ে) না হওয়াটা ভালো না? এই সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার দরকার।
থ্যালাসিমিয়া প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে গণমাধ্যম ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
জাহিদ হোসেন বলেন, থ্যালাসিমিয়া রোগীর চিকিৎসায় প্রথম কাজ হচ্ছে রক্তদান। ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে অন্তত ১০ কোটি মানুষ আছে, যারা রক্ত দান করতে পারে। আমাদের যে রোগী আছে, ১ কোটি ব্যাগ রক্তও লাগবে না।
থ্যালাসিমিয়া চিকিৎসায় ওষুধ সংকটের কথা উল্লেখ করে এই চিকিৎসক বলেন, রক্ত বেশি দিলে আয়রন বেড়ে যায়। আয়রন কমাতে ওষুধ দেয়া হয়। যেহেতু রোগী কম, এই ওষুধ চলে কম। চলে কম দেখে উৎপাদকরা বানায় কম, বানায় কম বলে দাম বেশি হয়।
সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে এই ওষুধের উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ২০২৬ সালে বলার কোনো সুযোগ নাই, এই ওষুধ পাওয়া যায় না। যদিও এর ভূমিকা কম। বেশি ভূমিকা রাখতে পারে জনসচেতনতা ও রক্ত।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী বলেন, আমাদের পলিসি এবং আমাদের চিন্তা-ভাবনা কীভাবে এটা করতে হবে, এটার একটা দারুণ দৈন্যতার মধ্যে আমরা আছি। কোনটাকে আগে গুরুত্ব দেবো, কোনটাকে কম দেবো । যার যার অসুখ, তার ব্যথা সবার কাছে। যে পরিবারে একটা থ্যালাসিমিয়া রোগী আছে, সে বোঝে তার কী কষ্ট! যে পরিবারে একটা ডায়ালাইসিসের পেশেন্ট আছে, সে জানে ডায়ালাইসিস মেনটেইন করা কী কঠিন। অনুধাবন করাও খুবই কষ্টকর, যদি না আপনার জ্ঞান থাকে।
তিনি আরও বলেন, একটা ডিজেবল চিলড্রেনকে টেক কেয়ার করা, তাকে সমাজে অন্যদের সঙ্গে সমানতালে চলার মতো একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে দেয়া; এটা ভিন্ন কাজ। আমাদের সরকারের প্রতিশ্রুতি, আমরা একটা মানবিক সমাজ ব্যবস্থা, মানবিক বাংলাদেশ চাই।
