আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শেফ জাহেদের সাফল্যের গল্প

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশি শেফ জাহেদের সাফল্যের গল্প

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের রন্ধনশিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত করতে যেসব শেফ নিরলসভাবে কাজ করছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশি শেফ জাহেদ। গত দশ বছরের পথচলায় মধ্যপ্রাচ্যের শীর্ষ ফাইভ-স্টার হোটেলগুলোতে নিজের দক্ষতা ও সৃজনশীলতা দিয়ে তিনি তৈরি করেছেন এক শক্ত অবস্থান। সাধারণ একজন শেফ থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত একটি নাম হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা এবং রান্নার প্রতি গভীর ভালোবাসা।

পেশাদার জীবনের শুরু ২০১৬ সালে, দুবাইয়ের একটি স্বনামধন্য কালিনারি ইনস্টিটিউট থেকে ‘কালিনারি আর্ট’-এ ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার মাধ্যমে। পড়াশোনা শেষ করেই তিনি যুক্ত হন দুবাইয়ের ফুজাইরাহ শহরের ২০১৬ সালের টপ-রেটেড ফাইভ স্টার রিসোর্ট ‘লা মেরিডিয়ান আল আকাহ বিচ রিসোর্ট’-এ। এখান থেকেই তার পেশাগত ভিত্তি তৈরি হয় এবং আন্তর্জাতিক মানের কিচেন পরিবেশে কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন শুরু করেন।

পরবর্তীতে তিনি ‘শেরাটন শারজাহ’ সহ দুবাইয়ের আরও বেশ কয়েকটি নামিদামি পাঁচতারা হোটেলে কাজ করেন। এই সময়েই তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তারকাদের জন্য রান্না করার সুযোগ পান, যা তাকে দ্রুতই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়।

দুবাই অধ্যায়ে তার অতিথি তালিকায় ছিলেনÑ দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম, ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনালের প্রেসিডেন্ট ও সিইও অ্যান্থনি ক্যাপুয়ানো। এছাড়া বলিউড সুপারস্টার অক্ষয় কুমার, অভিনেত্রী কারিশমা কাপুর, শ্রীলঙ্কান কিংবদন্তি ক্রিকেটার মুত্তিয়া মুরালিধরন এবং মরক্কো জাতীয় ফুটবল দলসহ বহু আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব তার রান্নার স্বাদ গ্রহণ করেছেন।
দুবাইয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার পর শেফ জাহেদ পাড়ি জমান সৌদি আরবে। সেখানে তিনি রিয়াদের ‘ম্যারিয়ট ডিপ্লোমেটিক কোয়ার্টার’ এবং ‘ম্যারিয়ট রিয়াদ’-এ কাজ করেন। তার দক্ষতা ও পারফরম্যান্স তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল ব্র্যান্ড ‘দ্য সেন্ট রেজিস রেড-সি রিসোর্ট’-এ। একই ব্যবস্থাপনার আওতায় তিনি কাজ করার সুযোগ পান ‘নুজুমা রিটজ-কার্লটন রিজার্ভ’-এ ও, যা তার ক্যারিয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করে।

সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় তিনি পরিবেশন করেছেন বিশ্বের প্রভাবশালী ভিআইপি অতিথিদের জন্য খাবার। এর মধ্যে রয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং রাজকুমারী সারা বিনতে মাশহুর আল সৌদসহ রাজপরিবারের সদস্যরা। এছাড়া ফুটবল বিশ্বের তারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার জুনিয়র ও করিম বেনজেমা এবং বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন ব্র্যান্ড ব্যালেন্সিয়াগার সিইও দেমনা গাভাসালিয়াও তার রান্নার অতিথি তালিকায় রয়েছেন।
২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যের হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিতে এই ধারাবাহিক সাফল্য শেফ জাহেদকে আন্তর্জাতিক মানের একজন টপ বাংলাদেশি শেফ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তার এই অর্জন নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা, যারা রন্ধনশিল্পকে পেশা হিসেবে নিতে চায়।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি আয়ারল্যান্ডে পাড়ি জমান এবং বর্তমানে সেখানে দুটি আইরিশ রেস্টুরেন্টে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন। একই সঙ্গে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন লিমেরিকের বিশ্বখ্যাত শ্যানন কলেজ অব হোটেল ম্যানেজমেন্টে।
শুধু আন্তর্জাতিক কিচেনেই সীমাবদ্ধ নয়, শেফ জাহেদ এখন বাংলাদেশে নতুন প্রজন্মের শেফ তৈরি করার দিকেও সমানভাবে মনোযোগী। ‘ঈড়ড়শরহম রিঃয লধযবফ’ তার বাংলা ফেসবুক এবং বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি শেফদের জন্য গাইডলাইন, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং ক্যারিয়ার নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন। তার লক্ষ্যÑ বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ শেফ তৈরি করা ও তাদের ক্যারিয়ার গড়াতে সাহায্য করা।

সব মিলিয়ে, শেফ জাহেদ এখন শুধু একজন সফল পেশাজীবী নন; তিনি একটি ব্র্যান্ড, একটি অনুপ্রেরণা এবং বাংলাদেশের রন্ধনশিল্পকে বিশ্বে তুলে ধরার এক নিরলস কর্মী। তার এই যাত্রা প্রমাণ করে, সঠিক দিকনির্দেশনা, পরিশ্রম এবং দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে একজন বাংলাদেশি শেফও বিশ্বমঞ্চে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন