ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের নিবন্ধ

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এসআইআর এবং বঞ্চনার কথা

ফন্ট সাইজ:

পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইমপেডিমেন্ট রিমুভাল বা এসআইআর ছিল এমন একটি বিশেষ কর্মসূচি, যা বিজেপি পরিকল্পনা করে, নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) বাস্তবায়ন করে এবং সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন দেয়। এটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল, যাতে বাংলায় ক্ষমতা দখলের মরিয়া চেষ্টায় বিজেপি’র সামনে থাকা জনসংখ্যাগত বাধা দূর করা যায়। ইসিআইয়ের বাইরে থেকে আনা কর্মকর্তাদের এক বাহিনী দিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা হয়, যারা প্রতিষ্ঠিত কাঠামো ও প্রক্রিয়া এড়িয়ে কাজ করেছে। আর সুপ্রিম কোর্টও বারবার এই প্রক্রিয়াকে অনুমোদন দেয়, যদিও তার আদেশের ফলে যে ভোটাধিকার বঞ্চনা ঘটতে পারে, তা আদালত পুরোপুরি বুঝতে পারেনি বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি।
গত ১০ মাসে এসআইআরের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়াকে আমরা প্রায় স্বাভাবিক করে ফেলেছি। কিন্তু সেই মানদণ্ডেও পশ্চিমবঙ্গ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। অথচ এমন হওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। বাংলার ভোটার তালিকায় কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না, যদি না বিষয়টি বিজেপি’র দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়।

প্রথমে ভোটারের সংখ্যা দেখুন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে, এসআইআর শুরুর আগে, বাংলার ভোটার তালিকায় ছিল ৭.৬৬ কোটি নাম। একই সময়ে রাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭.৬৭ কোটি। এত নিখুঁত ভোটার-জনসংখ্যা অনুপাত খুবই বিরল। তাই এই বিষয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ ছিল না। তৃণমূল কংগ্রেস কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় ব্যাপক নাম ঢোকানোর যে গুজব ছিল, তারও কোনো ভিত্তি নেই। ২০২৫ সালের জুন-আগস্টে নতুন নাম যুক্ত হয়েছিল মাত্র ৩.৫ লাখ (প্রায় ০.৪ শতাংশ)। এই সময় নাম অন্তর্ভুক্তির ৪১ শতাংশ আবেদনই বাতিল হয়। ফলে সরকারি যোগসাজশের সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায়।
এবার এসআইআরের প্রথম ধাপ। পশ্চিমবঙ্গের খসড়া এসআইআর তালিকায় মোট ৫৮ লাখ নাম বাদ দেয়া হয়, যা মোট ভোটারের ৭.৭ শতাংশ। এটি রাজস্থান (৭.৬ ভাগ) বা মধ্যপ্রদেশের (৭.৩ ভাগ) তুলনায় খুব বেশি ভিন্ন নয়। ‘আনম্যাপড ভোটার’ (যারা ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নিজেদের বা আত্মীয়ের নাম প্রমাণ করতে পারেনি) বাংলায় ছিল ৪.৫ শতাংশ, যা ছত্তিশগড় (৩.৫ ভাগ), তামিলনাড়ু (২.৩ ভাগ) বা রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের (১.৬ ভাগ) তুলনায় বেশি। অর্থাৎ এই পর্যায় পর্যন্ত এটি ছিল স্বাভাবিক এসআইআর- বড় আকারে এলোমেলো নাম বাদ দেয়া। এখানে এমন কিছু ছিল না যা বোঝায় যে, বাংলার ভোটার তালিকা অস্বাভাবিকভাবে ফুলে উঠেছিল বা তা ছাঁটাই করা হয়নি। ঠিক তখনই বিপদের সংকেত বেজে ওঠে।

আমরা কেবল অনুমান করতে পারি, বিজেপি’র সদর দপ্তর থেকে হয়তো নির্দেশ আসে। নির্বাচন সদনে (নির্বাচন কমিশনের সদর দপ্তর) ঘণ্টা বেজে ওঠে, আর ইসিআই একের পর এক ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নেয়। ইসিআই ৩০ জন রোল অবজারভার ও বিশেষ অবজারভার নিয়োগ করে, যারা ইআরওদের ওপর নজর রাখে। তাদের অধীনে কাজ করার জন্য ৮,০০০ মাইক্রো-অবজারভার নিয়োগ করা হয়, যাতে নির্দিষ্টভাবে নাম বাদ দেয়া নিশ্চিত করা যায়। তুলনা করলে দেখা যায়, উত্তরপ্রদেশে এ ধরনের অবজারভার ছিল মাত্র চারজন, আর অন্য কোনো রাজ্যে একটি মাইক্রো-অবজারভারও ছিল না। এত কিছু করেও কাক্সিক্ষত হারে নাম বাদ না পড়ায় ইসিআই ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি’ বা তথ্যগত অসঙ্গতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।

এটি একটি সফটওয়্যার পরীক্ষা, যা বর্তমান তথ্য ও ২০০২ সালের তথ্যের মধ্যে অমিল ধরতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে এই অসঙ্গতির হার অন্য রাজ্যের মতোই ছিল। কিন্তু অন্য রাজ্যে বানান ভুল বা বয়সের ভুলের কারণে হওয়া অসঙ্গতি সংশোধন করা হলেও বাংলায় তা করা হয়নি। বরং খসড়া ভোটার তালিকায় থাকা ১.৩ কোটির বেশি মানুষকে নোটিশ পাঠিয়ে বিশেষ শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়। তবুও এতে ৬ লাখের বেশি নাম বাদ দেয়া সম্ভব হয়নি। আর আইনগতভাবে এর বেশি নাম বাদ দেয়ার পথও ছিল না।
এরপর ইসিআই নিজস্ব ব্যবস্থার সঙ্গেই একটি কৃত্রিম বিরোধ দেখিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। আদালত তার বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে একটি বিশেষ বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলে ‘বিতর্কিত’ মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য। কিন্তু কোন মামলাগুলো এই পর্যায়ে যাবে, সে বিষয়ে কোনো স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়নি। হঠাৎ করে এই বিতর্কিত মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০ লাখ। আজও কেউ বলতে পারে না, কীভাবে ৭৬ লাখ অসঙ্গতি মিটে গেল এবং ৬০ লাখ মামলা বিচারাধীন হলো। আদালত কোনো স্পষ্ট নীতি দেয়নি যে কীভাবে এই বিচার হবে বা কয়েকশ’ বিচারক কীভাবে ৩৫ দিনের মধ্যে এত বিপুল মামলা নিষ্পত্তি করবেন। ফলে ফলাফল হওয়াটা ছিল অবধারিতÑ একটি বড় বিচারিক ব্যর্থতা, যার নজির সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেই।
৬০ লাখ মামলার মধ্যে ২৭ লাখ নাম বাদ পড়া, এটাই সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। এই মানুষগুলো ফরম পূরণ করেছে, নোটিশের জবাব দিয়েছে, শুনানিতে অংশ নিয়েছে, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (প্যান কার্ড, জন্ম সনদ, স্কুল সার্টিফিকেট, অনেক ক্ষেত্রে পাসপোর্ট ও আধার) জমা দিয়েছে। তবুও তারা জানে না কেন তাদের নাম বাদ দেয়া হলো।

এই কেলেঙ্কারির আরও দিক আছে। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই খসড়া তালিকার পর নাম বাদ পড়ার সংখ্যা বেড়েছে। এবং বাদ পড়া মানুষের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। শেষ দৃশ্যটা কিছুটা প্রহসনের মতো। ভোটের সময় ঘনিয়ে আসায় সুপ্রিম কোর্ট দ্রুত আপিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। কিন্তু এগুলো কার্যকর হতে পারেনি। প্রায় ৩৪ লাখ আপিলের মধ্যে মাত্র ৬৫৭টি নিষ্পত্তি হয়েছে। সাবার ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ বলছে, আদালত যে সিদ্ধান্তগুলোর ওপর ভরসা করেছিল, তার প্রায় ৮৯ শতাংশই পরে এই ট্রাইব্যুনাল বাতিল করেছে।
একটি ট্র‍্যাজেডির সঙ্গে একটু হাস্যরস মিশিয়ে দিলে যা হয়- পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর ঠিক তাই, এক নিখুঁত প্রহসন।

(লেখক: স্বরাজ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং ভারত জোড়ো অভিযানের জাতীয় আহ্বায়ক। অনলাইন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন