ইউনেস্কো-টিআইবি’র আলোচনা সভায় বক্তারা

গণমাধ্যমে জনআস্থা তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিরাজমান বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি, ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়া ও অপ-তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাসহ নানাবিধ সমস্যা উতরে গণমাধ্যমে জনআস্থা তৈরিতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বক্তারা।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও ইউনেস্কোর যৌথ আলোচনা সভায় এসব পরামর্শ দেন তারা। তাছাড়া আলোচনা সভায় টিআইবি’র পক্ষ থেকে বিগত বছরগুলোতে সাংবাদিকদের হয়রানি ও হামলা-মামলার চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্বাধীন সংবাদমাধ্যম এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রচারের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালন করছে বিশ্ব। তার ধারাবাহিকতায় রোববার ঢাকার টিআইবি কার্যালয়ে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। দেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, টিআইবি নেতৃবৃন্দসহ ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা আলোচনায় অংশ নেন।

আলোচনা সভায় প্রতিনিধিরা জানান, গণতান্ত্রিক শাসনের জন্য গণমাধ্যমের ওপর জনআস্থা অত্যন্ত জরুরি, যা নাগরিকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে, তথ্যভিত্তিক জনবিতর্কে অংশ নিতে এবং ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সক্ষম করে। ইউনেস্কোর ওপর গুরুত্বারোপ অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং তথ্যের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য স্বাধীন, বহুমাত্রিক এবং পেশাদার গণমাধ্যম অপরিহার্য।

আলোচনা সভায় যোগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সমপ্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে একটা দুর্দান্ত ভাইব্রেন্ট মিডিয়া আবার তৈরি হবে, এটা আমি দেখতে চাই। আমি আমার দায়িত্বের বাইরে থেকেও বলছি আর দায়িত্বে থেকেও বলা যায় যে, সরকার ভালো থাকবে যদি এই চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বজায় থাকে। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, এই সরকার বিটিভিকে এমনভাবে ব্যবহার করবে যেটা জনগণের কল্যাণে আসবে। কারণ বিটিভি একটা জাতীয় টেলিভিশন হিসেবে তার অনেক রকম রোল প্লে করার সুযোগ আছে।

একই কথা বেতারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমি ব্যক্তিগত আগ্রহে এটা নিয়ে ইতিমধ্যে বিটিভি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি এবং আমরা ভালো কিছু করতে পারব বলে মনে করি। অনুষ্ঠানে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যমের প্রতি জনআস্থা গণতান্ত্রিক শাসনের অন্যতম ভিত্তি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৩৮৯ জন সাংবাদিককে বিভিন্ন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে যারা বিজয়ী হয়েছেন বা তাদের প্রতিনিধিদের দিয়ে এসব হয়রানির শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কমপক্ষে ৪ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ব্যবহার করা হয়েছিল।

এরমধ্যে কমপক্ষে ৪৫০ এর বেশি ছিল মিডিয়া প্রফেশনাল। সেখানে ২৫০ জনকে আলাদাভাবে তাদের প্রফেশনাল কাজের জন্য টার্গেট করা হয়েছিল এবং তাদের বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণমাধ্যম রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত। দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের দেশের মিডিয়ায় ভিন্নমতকে নিয়ন্ত্রণ করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এর ফলে মিডিয়া ফ্রিডমের ওপর চাপ আসে। ইউনেস্কোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ বলেন, একটি স্বাধীন, বহুমাত্রিক ও পেশাদার গণমাধ্যমই তথ্যভিত্তিক জনআলোচনা নিশ্চিত করে।

বর্তমান তথ্যপ্রবাহের জটিল বাস্তবতায় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহ বজায় রাখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় বাংলাদেশের সুইডেন দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি পাওলো ক্যাস্ট্রো নেইদারস্টাম বলেন, আমরা বিশ্বব্যাপী সাংবাদিকদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে দেখেছি, যার মধ্যে রয়েছে তাদের নিরাপত্তার হুমকি এবং কাজের ওপর বিধিনিষেধ।

একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে আমাদের একসঙ্গে কাজ করা অপরিহার্য, যেখানে সংবাদকর্মীরা কোনো ধরনের প্রতিশোধের ভয় ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবেন। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান ও দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে, কারণ গণমাধ্যম যথেষ্ট স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি। এই স্বাধীনতার ওপরে আঘাত এসেছে দু’টো দিক থেকে। একটি হলো বিগত স্বৈরশাসনের নিয়ন্ত্রণ ও ভয়ভীতি। অন্যটি হলো অর্থনৈতিক কারণ। মালিকদের প্রভাব ও করপোরেট স্বার্থ। আলোচনায় যমুনা টিভি’র সিইও ফাহিম আহমেদ, ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ, সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নী প্রমুখ অংশ নেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন