বগুড়া সদরের নামুজা এলাকায় মল্লিকা সঞ্চয় সমিতির নামে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনায় অমানবিক পরিস্থিতিতে পড়েছে কয়েক শত গ্রাহক। অধিক মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে শত শত পরিবারকে পথে বসিয়ে সমিতির পরিচালক হেলাল উদ্দিন বর্তমানে একটি মামলায় জেলহাজতে থাকলেও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। এতে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হেলাল উদ্দিন একা নন, এই বিশাল অর্থ আত্মসাতের পেছনে রয়েছে একটি শক্তিশালী পারিবারিক সিন্ডিকেট। এই চক্রের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন হেলালের স্ত্রী আনোয়ারা, কন্যা মরিয়াম এবং পুত্র আল আমিন। শুধু তাই নয়, এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে গ্রাহকদের মুখ বন্ধ রাখতে হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন হেলালের বিয়াই হারুন এবং মেয়ের জামাই জিহাদ। এই সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়েছে এলাকার প্রায় ছয় শতাধিক সাধারণ মানুষ। হেলাল উদ্দিন গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে প্রতারিত গ্রাহকরা প্রতিকার পেতে আইনি লড়াই শুরু করেছেন। একের পর এক মামলা দায়ের হচ্ছে এই প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে।
ইতিমধ্যেই রুবিয়া সুলতানা, রেজাউর রহমান, সামান্তা মরিয়ম সিথি এবং বিদ্যুৎ সাহাসহ আরও বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী পরিচালক ও তার সহযোগীদের নামে মামলা দায়ের করেছেন। মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে চলমান রয়েছে। তবে প্রধান অভিযুক্ত জেলে থাকলেও তার পরিবারের বাকি সদস্যরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোয় ভুক্তভোগীরা মামলার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত। সমিতিতে টাকা জমা রেখে এখন সর্বস্ব হারানো অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিলুফা খাতুন নতুন করে তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার সারাজীবনের উপার্জিত ২৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা বিশ্বাস করে হেলালের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের মিলে প্রায় দেড় কোটি টাকা এখন এই সমিতির পেটে। দীর্ঘদিন ধরে টাকার জন্য তার দুয়ারে ঘুরেছি, কিন্তু প্রতিবারই সে শুধু সময় ক্ষেপণ করেছে। এখন আমি সন্তানদের নিয়ে অন্ধকার দেখছি। নতুন করে মামলা করা রুবিয়া সুলতানা বলেন, আমরা অতি সাধারণ মানুষ। একটু বাড়তি লাভের আশায় কষ্টার্জিত টাকাগুলো ওদের দিয়েছিলাম।
এখন শুনি সব টাকা নাকি তারা জমি আর বাড়ি কেনায় শেষ করে ফেলেছে। আমরা বিচার চাই এবং আমাদের টাকা ফেরত চাই। মামলার আরেক বাদী রেজাউর রহমান বলেন, হেলাল জেলে থাকলেও তার পরিবারের বাকিরা আমাদের উল্টো হুমকি দিচ্ছে। প্রশাসন কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না তা আমাদের বোধগম্য নয়। অভিযোগ রয়েছে, মামলার জালে আটকা পড়ার আগেই হেলাল উদ্দিন কৌশলে নামুজা ও বিভিন্ন এলাকায় কেনা তার প্রায় ২৫ বিঘা জমি এবং উপশহরের আলিশান বাড়িটি মেয়ে মরিয়াম ও জামাই জিহাদের নামে লিখে দিয়েছেন। যদিও জামাই জিহাদ এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, সব সম্পত্তি এখনো তার শ্বশুরের নামেই আছে।
উল্লেখ্য, ২০১০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই প্রতারণার জাল ২০১৮ সালে সমাজসেবা অধিদপ্তরের নিবন্ধন নিয়ে আরও বিস্তৃত হয়। সঞ্চয়ের পরিমাণ ৩০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার পরেই মূলত গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে টালবাহানা শুরু করে এই চক্র। বর্তমানে শত শত পরিবার তাদের পাওনা বুঝে পেতে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছে।
