কুঁড়ির এবার সৌরভ ছড়ানোর পালা

কুঁড়ির এবার সৌরভ ছড়ানোর পালা

ফন্ট সাইজ:

চায়ের নগরী সিলেটের আকাশজুড়ে তখন মেঘ-রোদের লুকোচুরি। কখনো তপ্ত রোদে স্টেডিয়ামের গ্যালারি চকচক করে উঠছে, আবার পরক্ষণেই নামছে ঝিরঝিরে বৃষ্টির শীতল পরশ। বৈশাখের এই খামখেয়ালি আবহাওয়াও ম্লান করতে পারেনি মাঠের উৎসবকে। বরং প্রকৃতির এই রং বদলের মাঝেই হাজারো শিশু-কিশোরের কলতানে মুখর হয়ে ওঠে সিলেট জেলা স্টেডিয়াম। তোরণ, ব্যানার আর বর্ণিল ফেস্টুনে সাজানো স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে গতকাল নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস কর্মসূচির বীজ বপিত হয়। দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে এ বীজ বপন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রকৃতিতে কুঁড়ি যেমন যত্নে ফুলে পরিণত হয়, তৃণমূলের অবহেলিত প্রতিভাও তেমনি সঠিক পরিচর্যায় বিশ্বজয় করতে পারে। ঝিমিয়ে পড়া ক্রীড়াঙ্গনে প্রাণসঞ্চার করে কিশোর-কিশোরীদের মাঠমুখী করার এই পদক্ষেপ যেন এক নতুন বসন্তের আহ্বান। এখন অপেক্ষা বিশ্বমঞ্চে কুঁড়িদের সৌরভ ছড়ানোর।

দশকের পর দশক ধরে ‘নতুন কুঁড়ি’ ছিল মেধা বিকাশের বড় সুযোগ। সেই জাদুর জানালা দিয়ে তাকালে একসময় দেখা যেত আগামীর সাংস্কৃতিক দিকপালদের মুখ। সময়ের বিবর্তনে সেই প্রদীপের শিখা স্তিমিত হয়ে এলেও সরকারের দূরদর্শী নেতৃত্বে সেই মশাল আবারো জ্বলে উঠেছে। তবে এবার শুধু সুর বা ছন্দের মূর্ছনা নয়, মেধা প্রস্ফুটিত হওয়ার মঞ্চ তৈরি হয়েছে ক্রীড়াঙ্গনে। ঘড়ির কাঁটায় যখন বিকাল ৫টা, তখন অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দেশব্যাপী এ প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনী ঘোষণায় তিনি বলেন, ‘আগামীর বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে তোমাদের ওপরে। তোমরা যত ভালোভাবে, সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে, বাংলাদেশ তত সুন্দরভাবে, তত শক্তিশালী ভিত্তির উপরে গড়ে উঠবে। আজ বাংলাদেশ তাকিয়ে আছে তোমাদের দিকে। আমরা শুরু করে দিয়ে যাবো, তোমাদেরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে।’

এর আগে বিকাল ৩টা ৪০ মিনিটে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে প্রবেশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার আগমনে পুরো গ্যালারি করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে। স্টেডিয়ামের চারদিকে প্রদক্ষিণ করেন তিনি। অতিথির আসন গ্রহণের পর মাঠের চারপাশ জুড়ে শুরু হয় নয়নাভিরাম প্রদর্শনী। আটটি ভিন্ন ভিন্ন ইভেন্টের ক্রীড়াশৈলী উপস্থিত দর্শকদের মোহিত করে। মাঠের এক কোণে যখন ফুটবলের শৈল্পিক কারুকাজ চলছে, অন্য প্রান্তে তখন দাবার বোর্ডে চলছে খুদেদের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির লড়াই। একদিকে কাবাডির অদম্য জেদ, অন্যদিকে মার্শাল আর্টের নিখুঁত ভঙ্গি- সব মিলিয়ে স্টেডিয়ামজুড়ে প্রতিভার বিচ্ছুরণ। গ্যালারিতে হাজার দশেক দর্শক আর অভিভাবকদের মুহুর্মুহু করতালি মাঠের এই খুদে যোদ্ধাদের যোগায় উৎসাহ। বিকাল ৫টা ৮ মিনিটে লাল বাটন চেপে সিলেটের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা বাকি ৬৩টি জেলা স্টেডিয়ামে একযোগে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর মাঠের চারপাশে হেঁটে শিশু-কিশোরদের সঙ্গে হাত মেলান প্রধানমন্ত্রী।

এবার নতুন কুড়ি স্পোর্টসে ১২-১৪ বছর বয়সী শিশু-কিশোররা মোট ৮টি ইভেন্টে অংশ নিচ্ছেন। ইভেন্টগুলো
হচ্ছে -ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, অ্যাথলেটিক্স, দাবা, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার ও মার্শাল আর্ট। ঢাকা, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ-এ দশটি অঞ্চলে ভাগ করে প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ দশ অঞ্চল থেকে প্রতিভা বাছাইয়ের পর জাতীয় পর্যায়ে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত করা হবে। প্রতিযোগিতায় একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ দুইটি খেলায় অংশ নিতে পারবে। এই প্রতিযোগিতায় আট ইভেন্টের জন্য রেজিস্ট্রেশন করেছেন ১ লক্ষ ৬৭ হাজার ৬৯৩ জন প্রতিযোগী। ছেলে ১ লক্ষ ২০ হাজার ৯৪৯ জন, মেয়ে ৪৬ হাজার ৭৪৪ জন। ঢাকা অঞ্চল থেকে সবচেয়ে বেশি ২৫ হাজার ৩৮৭ জন প্রতিযোগী রেজিস্ট্রেশন করেছেন। সবচেয়ে কম রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে ময়মনসিংহ অঞ্চলে। সেখানে ৭ হাজার ৯৬৬ জন রেজিস্ট্রেশন করেছেন। প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী শিশু কিশোররা যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও ক্রীড়া পরিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত হারে ভাতা পাবেন। অংশগ্রহণকারী প্রতিটি খেলোয়াড়কে জেলা পর্যায় থেকে স্ব স্ব ইভেন্টের জন্য নির্ধারিত মানসম্মত খেলোয়াড়ী পোশাক প্রদান করা হবে। উপজেলা,জেলা,আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী খেলোয়াড়দের কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ সনদপত্র প্রদান করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে বাছাইকৃত সেরা খেলোয়াড়রা দীর্ঘমেয়াদী আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প করার সুযোগ পাবেন।

সিলেটের এই পুণ্যভূমি থেকে যে যাত্রার শুরু হলো, তার লক্ষ্য বহুদূর। অকাল ঝরে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে এই মেধার কুঁড়িগুলো এখন কেবল প্রস্ফুটিত হওয়ার অপেক্ষায়। সেই সৌরভের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে পুরো বাংলাদেশ।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন