সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় বৈশাখের অর্ধেক সময় পার হলেও এবার হাওরে নেই ধান কাটার সেই চিরচেনা উৎসবমুখর পরিবেশ। অন্যান্য বছরের মতো খলায় খলায় ধান মাড়াই, শুকানো ও বহনের ব্যস্ততা না থাকায় পুরো হাওর জুড়ে বিরাজ করছে হতাশা। টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকদের মাঝে নেই আনন্দ-উচ্ছ্বাস। সাধারণত এ সময় হাওরাঞ্চলে শিশু থেকে বৃদ্ধ- সবার অংশগ্রহণে ধান কাটাকে ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। কিন্তু এবার সেই দৃশ্য অনেকটাই অনুপস্থিত।
গত পাঁচদিন পর কিছু সময়ের জন্য রোদের দেখা মিললেও আবারো শুরু হয়েছে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়া। ফলে অনেক হাওরে ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, কোথাও কোমর থেকে বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটাও সম্ভব হচ্ছে না। কৃষকদের অভিযোগ, টানা দশদিনের বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ২০০ কোটি টাকার ধান ক্ষতি হয়েছে। জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৯.৪২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে নিচু এলাকায় ৭১ শতাংশ এবং উঁচু এলাকায় ৫৮ শতাংশ। এ পর্যন্ত ১ লাখ ৩২ হাজার ৪১৮ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।
চলতি মৌসুমে জেলার ১৩৭টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। অন্যদিকে বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ১৫ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। তবে এ হিসাবের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন হাওর আন্দোলনের নেতা ও কৃষকরা। তাদের দাবি, বাস্তবে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি, প্রায় অর্ধেক ধানই নষ্ট হয়েছে। এদিকে নতুন করে শুক্রবার ও শনিবার ভোরে মধ্যনগর উপজেলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাইল্যানী উপ-প্রকল্পের ২০ নম্বর পিআইসি বাঁধের শালদিঘা ও বোয়ালা হাওরের দুইটি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে।
বাঁধ রক্ষায় মসজিদের মাইকিংয়ের মাধ্যমে মাদ্রাসা ও বাজারের লোকজনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে। এ ছাড়া তাহিরপুর উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের বৈঠাখালি বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকেছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলেছে এ বাঁধটি তাদের আওতাভুক্ত নয়। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি ২ ইঞ্চি কমে বিপদসীমার ৫ ফুট নিচে রয়েছে। তিনি বলেন, গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকরা সাময়িক স্বস্তিতে কাজ করতে পেরেছেন।
তবে সামনে ভারী বৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা রয়েছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করতে পারে। শনি ও মাটিয়ান হাওর ঘুরে দেখা যায়, খলা ও রাস্তার পাশে কাটা ধান স্তূপ করে রাখা হয়েছে। রোদের অভাবে সেগুলোতে পচন ধরছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় কৃষকরা অপেক্ষায় থাকলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত রোদ। শালদিঘা হাওরের কৃষক নিরঞ্জন সরকার বলেন, এই হাওরের অর্ধেকের বেশি জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। বাঁধ রক্ষা করা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে। তাহিরপুর উপজেলার শিক্ষক তৌফিক আহমেদ বলেন, অনেক টাকা খরচ করে চাষ করা ধান পানিতে ডুবে গেছে, আর কাটা ধান রোদ না থাকায় পচে যাচ্ছে। দেখার হাওরের কৃষক শামছুল ইসলাম জানান, বুড়িস্থল গ্রামের প্রায় দেড়শ’ পরিবার একই পরিস্থিতিতে রয়েছে।
শিয়ালমারা হাওর ডুবে যাওয়ার পর বাওনের হাওর নিয়ে আশা থাকলেও সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে সেটিও তলিয়ে গেছে। মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের কীর্ত্তিনগর, ধনপুর, যোগীরগাঁওসহ আশপাশের বহু গ্রামে একই চিত্র বিরাজ করছে। রসুলপুরের কৃষক ফারুক মিয়া বলেন, এই সময়ে মাঠে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকতো, ভ্রাম্যমাণ দোকান বসতো। এবার সেই দৃশ্য নেই। অনেক ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, শ্রমিকও পাওয়া যাচ্ছে না। মধ্যনগরের কৃষক রতন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাওরে বেশি সংখ্যক স্লুইস গেট স্থাপন ও টেকসই ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ জরুরি, যাতে আগাম বন্যা থেকে হাওর রক্ষা করা যায়।
বাঁধের কাজ দুর্বল হওয়ায় বৃষ্টি ও পানির একটু চাপেই ভেঙে ফসল তলিয়ে যাচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ওমর ফারুক জানান, জেলার ১২ উপজেলার ১৯৯টি হাওরে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫৯.৪২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে না এলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
