পাঁচদিনের অবিরাম বর্ষণে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে হারিয়ে গেছে কৃষকের মুখের হাসি। কেউ কাঁদছে পানিতে তলিয়ে যাওয়া মাঠের ধান গাছ ধরে। কেউ আহাজারি করছেন বাড়ির আঙ্গিনায় ধানের টালের দৃশ্য দেখে। চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সোনালি ধানগুলো। ভবিষ্যতের দুর্ভোগের হাতছানির কল্পনা করে চোখের পানি ঝরছে অনেকের। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক/গৃহস্থ কাঁচা ধান স্বল্প মূল্যে বিক্রি করছেন।
রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে দিনরাত ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদিত ফসল এভাবে সব কেড়ে নিবে তা কল্পনা করেননি তারা। তাদের সকল আশা ভরসার স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হওয়ার পথে। ধান কাটা ছোড়ার পরও রক্ষা করতে না পারায় চারিদিকে এখন শুধু হাহাকার।
সরজমিন অনুসন্ধান, ভুক্তভোগী কৃষক ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, গত পাঁচদিনের অবিরাম বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে উপজেলার নিম্নাঞ্চলে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে শাহজাদাপুর ইউনিয়নের শাপলা বিলের একপাশের আধাপাকা ও পাকা ইরি-বোরো ধানের শতাধিক বিঘা জমি পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া শাহবাজপুর, নোয়াগাঁও ও কালীকচ্ছ ইউনিয়নের তিতাস নদী ও আকাশি হাওরের শতাধিক জমিও গিলছে পানি। কষ্টে জমিতেই করছেন চিৎকার আহাজারি।
এ বছর উৎপাদন হয়েছিল ভালো। মনের মতো করে ধানগুলো ঘরে তোলার আশায় বুক বেঁধেছিলেন কৃষকরা। উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের বেশ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে বৈশাখের প্রথম দিকেই। গত ২৭শে এপ্রিল ২-১ দিন আগে কাটা জমির শতশত মণ ধান নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। কারণ ওইদিন থেকেই এখানে আর সূর্যের দেখা মিলছে না। কেউ কাটা ধানের আঁটিগুলো টাল দিয়ে রেখেছেন। কেউ মেশিনে ছোড়া ধান ঘরে বা উঠানে টাল দিয়ে পালিথিন দিয়ে মুড়িয়ে রেখেছেন। অনেকে সিদ্ধ করেছেন।
আবার সিদ্ধ ছাড়াও রয়েছে। একাধারে গত ৫/৬ দিন ধরে রোদ্র না থাকায় শত সহস্র মণ ওই ধানগুলোতে এখন পচন ধরেছে। ধানের স্তূপ দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। দুর্গন্ধ বের হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা ভবিষ্যতে এখানকার গ্রামগুলোতে চালের আকাল দেখা দেয়ার শঙ্কা করছেন। দেওড়া গ্রামের কৃষক মো. জয়নাল মিয়া বলেন, অনেক সুন্দর আবহাওয়া দেখে ধান কেটে বাড়িতে এনেছিলাম। এরপর থেকেই বৃষ্টি আর থামছে না।
রোদের অভাবে ধান পচে যাচ্ছে। কাঁচা ধান বিক্রি করতে আশুগঞ্জ নিয়ে যাচ্ছেন অনেকে। ৯শ’ টাকা মণের ধান বিপদে পড়ে ৫-৬শ’ করে বিক্রি করছেন। বৃষ্টি আমাদের সবকিছু কেড়ে নিলো। মলাইশ গ্রামের কৃষক বিধান সরকার বলেন, শাপলা বিলের পাড়ের অনেক জমি পানির নিচে। কাটতে শ্রমিকের যে মজুরি যাবে ওই ধান বিক্রি করেও তা পাওয়া যাবে না। বাড়িতেও মাঠে শত সহস্র মণ ধান নিয়ে আটকে গেছি আমরা। রোদের অভাবে চোখের সামনে ধানগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এবার ধান শুকিয়ে ঘরে তুলতে পারার সম্ভাবনা দেখছি না।
আমাদের জন্য মনে হয় ভাতের মহামারি আসছে। ঈশ্বর যদি রক্ষা করেন। সরাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. একরাম হোসেন বলেন, পানির নিচে খুব বেশি তলিয়ে যায়নি। সরাইলে মোট ১৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে ইরি-বোরো চাষ করা হয়েছে। তবে অবিরাম বৃষ্টি সমস্যায় ফেলেছে। এতে ধানে ফাঙ্গাল অ্যাটাক হতে পারে। আর্দ্রতার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ধান কাটার পর আর্দ্রতা থাকে ২০-২৫ ভাগ।
বীজের জন্য কমপক্ষে ১২ ভাগ আর্দ্রতা আর খাবার বা গোলায় মজুত রাখতে ১৪ ভাগ আর্দ্রতা প্রয়োজন। আর্দ্রতা ঠিক রাখতে ড্রায়ার মেশিন আছে সেটার সহায়তা নেয়া যেতে পারে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আমাদের উপজেলায় ধানের ক্ষতি হবে।
