আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে (মে দিবস) বিশ্বজুড়ে লাখো শ্রমজীবী মানুষের বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজপথ। এ বছর শ্রমিকদের প্রধান দাবি মজুরি বৃদ্ধি, ন্যায্য অধিকার পাওয়া এবং বিশ্বে চলমান সকল যুদ্ধ বন্ধ করা। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হওয়ায় ক্ষোভ আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন মহাদেশ ইউরোপ, এশিয়া, আমেরিকা ও আফ্রিকার দেশগুলোতে একযোগে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচিতে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। ইউরোপিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ‘শ্রমিকরা আর যুদ্ধের মূল্য দেবে না।’ বিশ্বজুড়ে এমন বার্তাই এবারের সমাবেশগুলোতে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে, যা বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য ব্যাপকভাবে বাড়ছে। শ্রমিক নেতারা বলছেন, অনেক দেশে মানুষ এখন মাস শেষে টিকে থাকার জন্যই সংগ্রাম করছে। উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ সবখানেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ইউরোপে উত্তাল বিক্ষোভ: ফ্রান্সসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ‘রুটি, শান্তি ও স্বাধীনতা’ স্লোগানে হাজারো মানুষ রাস্তায় নামে। শ্রম আইন পরিবর্তনের জন্য ও কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তার প্রতিবাদে বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। শ্রমিকদের মুজুরি বৃদ্ধি এবং নিরাপদ কর্মক্ষেত্রের দাবিতে তারা সমাবেশ করে। বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও জনতা মুখোমুখি হবার খবরও পাওয়া গিয়েছে। বিশাল একটি র্যালি ঐতিহাসিক তাকসিম স্কয়ারে প্রবেশের চেষ্টা করলে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয় এবং শতাধিক মানুষকে আটক করা হয়।
এশিয়ায় ক্ষোভ: ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমিকরা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট সরাসরি তাদের জীবনে প্রভাব ফেলছে। জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিক ছুটির দিনেও কাজ করতে বাধ্য হয়। নিম্নমজুরির কারনে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। এসকল বিষয়ে সভা করে এশিয়ার অনেক দেশের মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ কর্মসূচি: যুক্তরাষ্ট্রে ‘মে ডে স্ট্রং’ ব্যানারে নজিরবিহীন কর্মসূচি পালিত হয়। হাজারো মানুষ কাজ নয়, স্কুল নয়, কেনাকাটা নয় আহ্বানে অংশ নিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ কর্মসূচি পালন করে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩,৫০০ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে জানা গেছে। এই সকল কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল ধনী-গরিব বৈষম্য, অভিবাসন নীতি ও কর্পোরেট প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো। এছাড়াও তারা স্লোগান দেয়, ‘ওয়ার্কার অভার বিলিওনার(আগে শ্রমিক পরে কোটিপতি)।’
লাতিন আমেরিকায় বৃহৎ সমাবেশ: চিলি, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা ও আর্জেন্টিনায় বিশাল সমাবেশ হয়েছে। শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের নামে শ্রমিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শকুনি চক্ষু উপেক্ষা করে কিউবায় বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্য ও গাজা পরিস্থিতি: গাজায় চলমান যুদ্ধের কারণে অনেক শ্রমিক সংগঠন মে দিবসের কর্মসূচি বাতিল করেছে। সেখানে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং মানবিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও আয় বৈষম্য একসঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। ইতোমধ্যে মন্দার আশঙ্কা বাড়ছে এবং শিল্প উৎপাদন ও কর্মসংস্থান খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মে দিবসের সূচনা হয় যুক্তরাষ্ট্রে ১৮৮৬ সালে আট ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে। সেই ঐতিহ্য ধরে আজও এটি শ্রমিক অধিকার আদায়ের প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে।
