মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন, তিনি দ্রুত ও নির্ণায়ক বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সংঘাত শুরুর মাত্র দশ দিনের মাথায়ই তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘অনেক দিক থেকেই ইতিমধ্যে যুদ্ধ জিতে গেছে।’
দুই মাস পর, লড়াই আপাতত স্থগিত হলেও যুদ্ধের নির্দিষ্ট কোনো সমাপ্তি দৃশ্যমান নয়। ওয়াশিংটন এখনও স্পষ্ট কৌশলগত সাফল্য পায়নি, আর একসময় সীমিত বলে বিবেচিত এই সংঘাত এখন বিশ্বকে ক্রমবর্ধমান এক জটিল সংকটে টেনে নিচ্ছে। যেখানে খুব কম দেশই লাভবান হচ্ছে, বরং প্রায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের জ্যেষ্ঠ ফেলো মেলানি সিসন বলেন, এই যুদ্ধে প্রকৃত কোনো বিজয়ী নেই। তবে কিছু দেশ তুলনামূলকভাবে পরিস্থিতি সামলাতে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
নিচে প্রধান পক্ষগুলোর অবস্থান তুলে ধরা হলো-
পরাজিতরা ইরানের জনগণ
বিশ্বের যেকোনো সংঘাতে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইরানে তার ব্যতিক্রম নয়। ইরানের মানুষ একদিকে বাইরের হামলা, অন্যদিকে ভেতরের দমনপীড়নের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হাজারো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে বেসামরিক অবকাঠামোও রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস ইন ইরানের তথ্যমতে, এতে ৩৬০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৭০০-এর বেশি বেসামরিক নাগরিক। ডনাল্ড ট্রাম্প এমনকি হুমকি দিয়েছেন- ইরানের শাসকরা তার শর্ত না মানলে তিনি দেশটির ‘পুরো সভ্যতাই ধ্বংস করে দেবেন।’
অন্যদিকে, ইরানের শাসকগোষ্ঠীও ভিন্নমত দমনে কঠোরতা বাড়িয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে দমননীতি আরও কঠোর হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এ বছরের শুরু থেকে ৬ শতাধিক মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। ডিসেম্বর-জানুয়ারির বিক্ষোভে হাজারো মানুষ নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও কঠোর হয়েছে। পাশাপাশি আট সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট বন্ধ। অর্থনীতিও বড় ধাক্কা খেয়েছে। চাকরি হারানো ও দারিদ্র্য বেড়েছে।
লেবাননের জনগণ
লেবাননের মানুষ বহু বছর ধরেই হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের সংঘাতের মাঝে আটকে আছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটি নাজুক যুদ্ধবিরতি ছিল। কিন্তু ইসরাইল যখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করে, তখন হিজবুল্লাহ ইসরাইলের দিকে হামলা শুরু করে।
এর জবাবে ইসরাইল ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান চালায়। ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া হামলায় ২,৫০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজায় ব্যবহৃত কৌশলই এখন লেবাননে প্রয়োগ করছে ইসরাইল। পুরো গ্রাম ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে। দক্ষিণ লেবাননের ৬ লাখ বাস্তুচ্যুত মানুষকে ঘরে ফিরতে দেয়া হবে না, যতক্ষণ না হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরাইলের জন্য হুমকি হয়ে থাকে।
উপসাগরীয় দেশগুলো
উপসাগরীয় দেশগুলো এমন এক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে, যা তারা চায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল এই দেশ। বেশিরভাগ হামলা প্রতিহত হলেও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যা দেশটির ব্যবসা ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে অবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলেছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়ায় ইরাক, কাতার ও কুয়েতের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কারণ তারা এই পথ দিয়ে তেল ও গ্যাস রপ্তানি করে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এসব দেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে এবং বলেছে, এই বছর তাদের অর্থনীতি সংকুচিত হতে পারে।
মার্কিন জনগণ
যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের ওপরও পড়েছে। জ্বালানি, বিমান ভাড়া ও বিভিন্ন সেবার দাম বেড়েছে। অনেক ব্যবসা জ্বালানি সারচার্জ যোগ করছে। মার্চে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৩.৩ ভাগে দাঁড়িয়েছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ২.৪ ভাগ। ভোক্তাদের আস্থা কমছে। ব্রুকিংসের সিসন বলেন, পরিস্থিতি ভালো নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি পরিবহনের জন্য তেলের ওপর নির্ভরশীল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ কম।
বৈশ্বিক অর্থনীতি
বিশ্বজুড়েই ভোক্তারা চাপের মধ্যে। এশিয়ায় পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। অনেক দেশ তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল। লাতিন আমেরিকায় মানুষ জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্যে ভুগছে। আফ্রিকার অর্থনীতিও চাপে রয়েছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় ধাক্কার সতর্কতা দিয়েছে। আইএমএফ আগে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ৩.৮ ভাগ হবে বলে ধারণা করেছিল। এখন তা ৪.৪ ভাগ হতে পারে বলে জানিয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়ে ৩.১ ভাগ করা হয়েছে।
ডনাল্ড ট্রাম্প
ট্রাম্প বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। এখনও তার ফল পাওয়া যায়নি। যুদ্ধ ছোট রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। সময় যত বাড়ছে, তার জনপ্রিয়তা তত কমছে। সাম্প্রতিক জরিপে তার অনুমোদন মাত্র ৩৭ ভাগ। তবে, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নেয়, তাহলে তিনি বিজয়ী হতে পারেন- যদিও তা স্বল্পমেয়াদে সম্ভব নয়।
ইসরাইল ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
একসময় ইরান-ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধ কল্পনাও করা যেত না। কিন্তু নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে যৌথ হামলায় রাজি করান, যা তার জন্য কৌশলগত সাফল্য। তিনি বলেছেন, আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দেব। যুদ্ধ ইরানের সামরিক শক্তি দুর্বল করেছে, যা নির্বাচনের বছরে তার জন্য সুবিধা হতে পারে। তবে ইসরাইলিরা বিশ্বাস করে না যে তারা জিতছে এবং গাজা যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের শাসনব্যবস্থা
ইরানের শীর্ষ নেতাদের অনেকেই নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিও রয়েছেন। তবে শাসনব্যবস্থা এখনও টিকে আছে এবং সেখানে নতুন নেতৃত্ব আরও কঠোর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে, যা তাদের কূটনৈতিক শক্তি বাড়িয়েছে।
ইউক্রেন
স্বল্পমেয়াদে এই যুদ্ধ ইউক্রেনের জন্য খারাপ খবর। অস্ত্র সরবরাহ কমে গেছে বলে দেশটির প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন। বিশ্বের মনোযোগও সরে গেছে। তবে ইতিবাচক দিকও আছে। ড্রোন প্রযুক্তিতে ইউক্রেনের দক্ষতা এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। আপাতত বিজয়ীর মধ্যে আছে চীন ও রাশিয়া।
চীন
বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক চীন এই সংকটেও তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। তারা তেলের মজুত বাড়িয়েছে, বিকল্প উৎস খুঁজেছে এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কূটনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছে।
জ্বালানি কোম্পানি
শেভরন, শেল, বিপিসহ বড় কোম্পানিগুলো উচ্চ তেলের দামে বিপুল মুনাফা করছে। অক্সফামের মতে, এ বছর তারা ৯৪ বিলিয়ন ডলার লাভ করতে পারে।
রাশিয়া
রাশিয়া উচ্চ তেল ও সারমূল্যের কারণে লাভবান হচ্ছে। মার্চে তাদের জ্বালানি আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই সংকট অনেক দেশকে নিরাপদ জ্বালানির দিকে যেতে উৎসাহিত করছে। ইউরোপ নতুন কৌশল নিয়েছে জ্বালানি ঝুঁকি কমাতে।
যুদ্ধ মানেই অস্ত্র ব্যবসার উত্থান। বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বাড়ছে এবং এই খাত লাভবান হচ্ছে, যদিও দীর্ঘমেয়াদে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
