ইরানের বিরুদ্ধে জলদস্যুতার মতো আচরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা দখল করে নেয়ার ইঙ্গিত

সিএনএনের রিপোর্ট

ইরানের বিরুদ্ধে জলদস্যুতার মতো আচরণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, কিউবা দখল করে নেয়ার ইঙ্গিত

ফন্ট সাইজ:

ইরানের একটি জাহাজ জব্দ করার সাম্প্রতিক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ‘এক অর্থে জলদস্যুর মতো’ আচরণ করেছে বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যুদ্ধে জয়ী হচ্ছে না, এটা বলা রাষ্ট্রদ্রোহিতামুলক। তিনি মজা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র খুব শিগগিরই কিউবা ‘দখল’ করে নিতে পারে। তিনি এক বন্ধুকে ইঙ্গিত করে বলেন, সে মূলত কিউবা থেকে এসেছে- যেটি আমরা খুব শিগগিরই দখল করে নেব। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।

শুক্রবার রাতে এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, আমাদের সামরিক বাহিনী অসাধারণ, আমাদের নৌবাহিনীও দুর্দান্ত। তিনি স্মরণ করেন, সম্প্রতি মার্কিন বাহিনী একটি জাহাজের ইঞ্জিন কক্ষে গুলি চালায়, যা তার ভাষায় ‘আয়রন ওয়াল’-এর দিকে ধাক্কা দিতে যাচ্ছিল। তিনি সম্ভবত গত মাসে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস স্প্রুয়ান্স কর্তৃক ইরানি পতাকাবাহী ‘তৌসকা’ জাহাজ আটকের ঘটনাকে উল্লেখ করছিলেন। ওই জাহাজটি অবরোধ ভেঙে একটি ইরানি বন্দরের দিকে যাচ্ছিল। ট্রাম্প বলেন, জাহাজটি থেমে যায়। তারা টাগবোট ব্যবহার করে, তারপর আমরা সেটির ওপর নেমে পড়ি- সবকিছুর ওপর। আমরা জাহাজটির দখল নিই। কার্গো দখল করি, তেল দখল করি। এটা খুব লাভজনক ব্যবসা। তিনি এটিকে ‘জলদস্যুতার মতো’ বলেও মন্তব্য করেন।

ঘটনাটি ঘটার সময় ইরানের সামরিক বাহিনী এটিকে ‘সামুদ্রিক মহাসড়কে ডাকাতি’ এবং ‘জলদস্যুতা’ বলে আখ্যা দেয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবি-এ প্রকাশিত এক বার্তায় বলা হয়, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সশস্ত্র বাহিনী খুব শিগগিরই এই মার্কিন সশস্ত্র জলদস্যুতার জবাব দেবে এবং প্রতিশোধ নেবে।

ওদিকে কিউবা ইস্যুতে তিনি ইঙ্গিত দেন, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরই কিউবার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। ট্রাম্প বলেন, আমরা আগে একটি কাজ শেষ করব- আমি কাজ শেষ করতে পছন্দ করি। তারপর ইরান থেকে ফেরার পথে আমরা আমাদের বড় জাহাজগুলোর একটি- হয়তো ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন পাঠাব। সেটি উপকূল থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে থামবে, আর তারা বলবে, ‘ধন্যবাদ, আমরা আত্মসমর্পণ করছি।’

এই মন্তব্য করার সময় ট্রাম্পকে হাসতে দেখা যায় এবং উপস্থিত দর্শকরাও হাসিতে ফেটে পড়েন। একই দিনে তিনি কিউবার সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।

ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি না হলেও যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত ভালো অবস্থায় থাকবে। কারণ আলোচনায় আবারও অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, সত্যি বলতে কী, হয়তো চুক্তি না করাই আমাদের জন্য ভালো। কারণ আমরা এই বিষয়টাকে আর চলতে দিতে পারি না। এটা অনেক দিন ধরে চলছে। এর আগে শুক্রবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইরানের সাম্প্রতিক প্রস্তাবে তিনি সন্তুষ্ট নন। তিনি আরও বলেন, তার সামনে দুটি পথ- ‘আমরা কি গিয়ে তাদের পুরোপুরি ধ্বংস করে দেব? নাকি আমরা একটা চুক্তি করার চেষ্টা করব?’

একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে কারণ ‘উন্মাদদের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকতে পারে না।’ এমন সময় তিনি এই মন্তব্য করলেন, যখন রিপাবলিকান এই নেতা যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসকে জানিয়েছেন যে যুদ্ধটি সমাপ্ত হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধসীমা ছিল, যা বাড়াতে হলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন হতো। তবে সেই সময়সীমা ঘিরে অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও তার কথার আক্রমণ থামেনি। ফ্লোরিডার ওই অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যকে একটি ‘অতি আগ্রাসী পারমাণবিক শক্তিধর ইরান’-এর হাত থেকে রক্ষা করেছে। তিনি বলেন, আমরা বি-টু বোমারু বিমান দিয়ে তাদের (ইরান) থামিয়েছি। যদি আমরা তা না করতাম, তারা পারমাণবিক অস্ত্র পেয়ে যেত। ইসরাইল, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ ধ্বংস হয়ে যেত।

ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরান ভয়াবহভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, তাদের কোনো নৌবাহিনী নেই, কোনো বিমানবাহিনী নেই, কোনো বিমান প্রতিরক্ষা নেই, কোনো রাডার নেই। তাদের নেতারাও আর নেই।

শুক্রবার ইরানের দেয়া সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ট্রাম্প বলেন, এই সংঘাত আগেভাগে শেষ করা হবে না। তিনি বলেন, আমরা এখনই সরে যাব না এবং তিন বছরের মধ্যে আবার একই সমস্যা তৈরি হতে দেব না। তিনি তেহরানের ‘বিভক্ত নেতৃত্ব’কে দায়ী করে বলেন, তারা আমাদের প্রয়োজনীয় ধরনের চুক্তি দিচ্ছে না। তাদের নেতৃত্ব খুবই বিচ্ছিন্ন। তারা সবাই চুক্তি করতে চায়, কিন্তু তারা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল।
এই প্রস্তাবটি পাকিস্তানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছিল, যা বৃহস্পতিবার রাতে ইরান ইসলামাবাদের কাছে হস্তান্তর করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এখনও টিকে আছে বলে মনে হচ্ছে, যদিও উভয় পক্ষই একে অপরকে তা লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। ইরানে সংঘর্ষ অনেকটাই থেমে গেলেও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত।

ওদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি শুক্রবার তুরস্ক, মিশর, কাতার, সৌদি আরব, ইরাক ও আজারবাইজানসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে ধারাবাহিক ফোনালাপ করেন। তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনুযায়ী, তিনি যুদ্ধ শেষের সর্বশেষ উদ্যোগ সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন।
পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত দুই দফা আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, প্রথম দফায় সম্ভাব্য সর্বোত্তম প্রস্তাব দেয়া হলেও কোনো অগ্রগতি হয়নি। দ্বিতীয় দফা আলোচনার পর ট্রাম্প বলেন, ‘আর ১৮ ঘণ্টার ফ্লাইট নয়,’ কারণ ইরান সরাসরি আলোচনায় রাজি হয়নি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন