যশোর থেকে উত্থান টিটনের

যশোর থেকে উত্থান টিটনের

ফন্ট সাইজ:

ঢাকার নিউমার্কেট বটতলায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন যশোরের ক্রীড়া জগতের এককালের পরিচিত মুখ। সে ছিল যশোর জেলা ফুটবল দলের কৃতী খেলোয়াড়। নব্বই দশকে যশোরের ক্রীড়াঙ্গনকে নেতৃত্ব দিতেন টিটন। কিন্তু কালক্রমে নানা ঘটনার উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে সে বনে যায় দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী। ফলে গুলিতে নিহত হওয়ার খবরে টিটনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে তার অতীত, পারিবারিক পটভূমি এবং বিস্তৃত অপরাধ সাম্রাজ্য। এদিকে বুধবার রাতে ঘাতকের বুলেটে প্রাণ হারানো টিটনকে দাফন করা হয় যশোর কারবালা কবরস্থানে। বাদ এশা কারবালা মসজিদে জানাজার নামাজ শেষে তাকে তার ছোট ভাই আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী টুটুলের কবরে সমাহিত করা হয়।

জানাজায় টিটনের দীর্ঘ দিনের খেলার সাথী, সহপাঠীসহ জেলা ক্রীড়াঙ্গনের পরিচিত জনেরা অংশগ্রহণ করেন। জানা যায়, টিটনের পৈতৃক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়। স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত। তার পিতা মরহুম খন্দকার মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন খুলনার ইস্টার্ন জুট মিলের কর্মকর্তা ছিলেন। ৬ ভাই ও ৫ বোনের পরিবারে জন্ম নেয়া টিটন ছিলেন মা-বাবার চতুর্থ সন্তান। যশোর জিলা স্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে এসএসসি পাসের পর ভর্তি হন যশোর সরকারি এম এম কলেজে। ছাত্রজীবনে মেধাবী টিটন খেলাধুলায় ছিলেন তুখোড়। যশোর জেলা ফুটবল দলের হয়ে দেশে-বিদেশে বহু টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। টিটন যশোরের হয়ে ঢাকার একাধিক লীগে ফুটবল খেলেছেন। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতা তাকে বেশি দূর এগুতে দেয়নি।

স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ মুহূর্তে যশোরের কারবালা এলাকা থেকে প্রথম পুলিশের হাতে আটক হয়ে জেলজীবন শুরু হয়। ওই অন্ধকার জীবনে প্রবেশের অভিজ্ঞতা নিয়েই তার অন্ধকার জগতে হাঁটা শুরু। যার শেষ পরিণতি ঘটে গত ২৮শে এপ্রিল ঢাকার নিউমার্কেট বটতলা এলাকায়। বসিলা পশুহাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের ক্যাডাররা পরিকল্পিতভাবে কপালে গুলি করে হত্যা করে টিটনকে। পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, টিটন ছিলেন অবিবাহিত এবং দীর্ঘদিন ধরেই আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় ছিলেন। যশোরের পরিবারের ভাই-বোনদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না। তার ছোট ভাই টুটুলও একই পথে হেঁটে শত্রুর বুলেটে প্রাণ হারায়। স্থানীয়দের দাবি, তাদের অপরাধজগতে প্রবেশের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের, যিনি টিটনের আপন ভগ্নিপতি। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে টিটন ও টুটুল যশোরে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

চাঁদাবাজি, জমি দখল, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসাসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন তারা। ১৯৯৯ সালে ঈদুল ফিতরের দিন বিকালে যশোরের কারবালা এলাকায় মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বিএনপিকর্মী মোসলেম উদ্দিন খোকন ও টিপুকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে টুটুল। অবশ্য পরের বছরই র‌্যাবের ক্রস ফায়ারে নিহত হন টুটুল। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর টিটন আর টুটুল ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে সুব্রত বাইন, জসেফ, ইমনের মতো বড় বড় অপরাধী চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন। টিটন ধীরে ধীরে দেশের অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হন। ২০২১ সালে প্রকাশিত দেশের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় টিটনের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। একই তালিকায় তার ভগ্নিপতি ইমনের নামও ছিল। সূত্র বলছে, টুটুলের মৃত্যুর পরে টিটন ঢাকায় অবস্থান নিয়ে তার ভগ্নিপতি অপর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের ছত্রচ্ছায়ায় থেকে তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন।

বিগত ১৪-১৫ বছরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বড় বড় ক্রাইম ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এই ইমন চক্রের সম্পৃক্ততা ওপেন সিক্রেট। যদিও ইমন-টিটন গংরা নেপথ্যে থেকে এসব অপরাধ সংঘটিত করতেন তবুও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়ে জেল খেটেছেন। ২০০৪ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে আটক হয় টিটন। ২০১৪ সালে বাবর-এলাহী জোড়া হত্যা মামলায় আদালত টিটনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। এরপর থেকে সে বিভিন্ন সময়ে ঢাকা, যশোর ও চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিল। ২০২৪ সালের ৯ই আগস্ট টিটন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন অপরাধজগতে।

স্থানীয়দের অভিযোগ-টিটন যশোর-ঢাকা রুটে একটি শক্তিশালী অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র এনে যশোর হয়ে ঢাকায় সরবরাহ করা হতো। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেয়া হতো। যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মাসুম খান জানান, দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন যে যশোরের ছেলে তা তার জানা ছিল না। তিনি নতুন দায়িত্ব নেয়ায় এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তার কাছে নেই। এই হত্যাকাণ্ড নতুন করে দেশের আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার লড়াই এবং সংগঠিত অপরাধ চক্রের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন