নিজের শ্রম আর ঘামে উৎপাদিত সোনালি ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কাকাইলছেও ইউনিয়নের মাহমুদপুর গ্রামের কৃষক ময়না মিয়া। আকস্মিক পাহাড়ি ঢল আর অতিবৃষ্টিতে বাঁধভাঙা পানি কেড়ে নিয়েছে তার স্বপ্ন, রেখে গেছে শুধু একবুক হাহাকার, শুধু তিনি নন, এমন অবস্থা প্রায় সব কৃষকের। আজমিরীগঞ্জের হাওরাঞ্চলের নিচু এলাকার অসংখ্য কৃষকের গল্প এখন এমনই। ঘাম ঝরানো ফসল হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া এসব কৃষকদের চোখে এখন কেবলই অন্ধকার ও ঋণের বোঝা।
কৃষক লকোজ মিয়া জানান, প্রতি কেদার (২৮ শতাংশ) জমিতে ধান রোপণ করতে মোট খরচ হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা, ১ কেদার জমির ধান কাটতে গুনতে হয় ৪/৫ হাজার টাকা, মাড়াই করতে খরচ ৩ হাজার টাকা। ধান হয়েছে প্রতি কেদার জমিতে ১৪-১৬ মণ, বিক্রি করতে হয়েছে ৬৫০ টাকা মণে। কিছু জমি কাটা হলেও অধিকাংশ জমি পানির তলদেশে চলে গেছে। নেই শ্রমিক ও নৌকা। নিজের চেষ্টায় যদি কিছু জমি কেটে আনতে পারি তাহলে ঋণের বোঝা একটু হালকা হবে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় মোট ১৪ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ১৫৫ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টি ও ঢলের কারণে কাকাইলছেও বদলপুর, সদর জলসুখা, শিবপাশা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে প্রায় ১৬০০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
সরজমিন বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে, নিম্নাঞ্চলের জমি বৃষ্টির পানিতে নিমজ্জিত। এমন পরিস্থিতিতে অনেকে ডুবন্ত জমি থেকেই ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। নৌকাযোগে সেই ধান উঁচু জায়গায় আনা হলেও রোদ না থাকায় ধান থেকে নতুন করে চারা গজাচ্ছে। এতে ধানের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। বদলপুর ইউনিয়নের আয়রামুগুর গ্রামের কৃষক ব্রজেন্দ্র দাস জানান, প্রায় ৫ একর জমিতে ধান রোপণ করে এখন পর্যন্ত ২ একরের মতো কাটতে পেরেছি, বাকি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় শ্রমিক সংকট প্রকট হওয়ায় তিনি দিশাহারা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানান, কৃষি বিভাগ সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। শ্রমিক সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসনের কাছে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাকি ধান দ্রুত কাটার ব্যবস্থা নেয়া হবে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রেজাউল করিম জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। শ্রমিক সংকট কাটাতে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে জরুরি সভা করা হয়েছে এবং দ্রুত শ্রমিক সরবরাহের চেষ্টা চলছে।
