ইউরোপে অভিবাসন নীতিতে সাম্প্রতিক পরিবর্তনের ফলে স্পেন সরকার প্রায় ৫ লাখ অনিয়মিত অভিবাসীকে বৈধ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নথিপত্র জটিলতার কারণে হাজারো প্রবাসী সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই সংকট এখন শুধু প্রশাসনিক নয় বরং একটি গভীর মানবিক, আইনি এবং কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য পাসপোর্ট ও নথিপত্র জটিলতা এখন সবচেয়ে বড় বাধা। জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মসনদ এবং পাসপোর্টের তথ্যগত অসামঞ্জস্যের কারণে হাজারো প্রবাসী পাসপোর্ট সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে তারা বৈধ হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন, রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন আটকে যাচ্ছে, চাকরি ও আয়ের পথ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে এবং অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন অবৈধ অবস্থায় থাকতে।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ই-পাসপোর্ট পেতে হলে এনআইডি বা জন্মসনদের তথ্যের সঙ্গে সব তথ্য হুবহু মিলতে হয়। নাম, জন্মতারিখ বা ইংরেজি বানানে সামান্য ভুল থাকলেও আবেদন বাতিল হয়। এনআইডি বা জন্মসনদের তথ্যই চূড়ান্ত হিসেবে ধরা হয়। ফলে পুরনো এমআরপি পাসপোর্ট, জন্মসনদ ও এনআইডির মধ্যে অমিল থাকলে আবেদন সরাসরি বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো- বিদেশে বসে এই ভুল সংশোধনের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। ফ্রান্স প্রবাসী নূর আলম বলেন “আমার স্ত্রীর নাম জোবেয়দা, কিন্তু এনআইডিতে ইংরেজি বানানে ভুল আছে। এখন পাসপোর্ট আবেদন নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছি।”
ফ্রান্সের আরেক প্রবাসী বলেন, “এক অক্ষরের ভুলের কারণে পাসপোর্ট পাইনি। পরে দালালের মাধ্যমে টাকা খরচ করে ঠিক করতে হয়েছে।”
পর্তুগাল প্রবাসী কালা মিয়া বলেন, “আমার সব নথির তথ্য মেলে না। এখান থেকে ঠিক করা সম্ভব না, বাংলাদেশে যেতে হবে, যা অনেক ব্যয়বহুল।”
ইতালি প্রবাসী তায়েফ আহমেদ বলেন, “স্পেনে বৈধ হওয়ার সুযোগ ছিল, কিন্তু পাসপোর্ট না থাকায় পারিনি। এখন আবার ঝুঁকিতে আছি।”
ফ্রান্স প্রবাসী এলাহি বলেন, “আমার সন্তানরা এখানে জন্ম নিয়েছে। দেশে যেতে চাই, কিন্তু পাসপোর্ট করতে পারছি না।” স্পেনে প্রবাসী রায়েল আহমদ বলেন, “সব ডকুমেন্ট আছে, কিন্তু পুলিশ ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় আবেদন করতে পারছি না।”
স্পেন প্রবাসী সাংবাদিক বকুল খান বলেন, “এই সুযোগ সময়সীমাবদ্ধ। অনেকেই কাগজের অভাবে আবেদন করতে পারছেন না।” ফ্রান্স প্রবাসী সাংবাদিক ফেরদৌস করিম আকুঞ্জি বলেন, “আমার এক সম্বন্ধিক স্পেনের এই সুযোগ নিতে পারছেন না পাসপোর্ট জটিলতার কারণে। তার মতো অনেক বাংলাদেশি নথিপত্র জটিলতার কারণে বৈধ হওয়ার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে অবৈধ অবস্থায় রয়ে যান। অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হন।
তিনি আরও বলেন নথিপত্রের জটিলতার কারণে বৈধ হওয়ার সুযোগ এলেও অনেকের স্বপ্ন ভেঙে যায়।” ফ্রান্সভিত্তিক অভিবাসী সহায়তা সংগঠন লিগ্যাল এইড-এর চেয়ারম্যান আজাদ মিয়া বলেন, “ফ্রান্সে বৈধ হওয়ার সুযোগ আছে, অনেকেই হচ্ছেন। কিন্তু পাসপোর্ট ও নথিপত্রের জটিলতার কারণে অনেকের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক প্রবাসী মানবেতর জীবনযাপনের দিকে ধাবিত হচ্ছেন।”
দূতাবাসের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের এনআইডি সংশোধনের সরাসরি ক্ষমতা নেই।” প্রবাসীদের মতে, এই সমস্যার সমাধানে সরকারের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন। একক ডিজিটাল ডাটাবেসে এনআইডি, জন্মসনদ ও পাসপোর্ট একীভূত করা, বিদেশে বসেই তথ্য সংশোধনের ব্যবস্থা চালু করা, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দ্রুত ও স্বচ্ছ করা, দূতাবাসকে সীমিত প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রদান, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ দ্রুত সেবা সেল চালু করা এবং দালাল নির্ভরতা কমাতে সরকারি অনলাইন সেবা সহজ করা জরুরি।
এই সংকট এখন আর ব্যক্তিগত সমস্যা নয়। এটি একটি রাষ্ট্রীয় মানবিক ইস্যু, যা দ্রুত সমাধান না হলে হাজারো প্রবাসীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যাবে।
