সিলেটে হাম আক্রান্ত বা উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অনেক শিশুই রয়েছে ক্রিটিক্যাল অবস্থায়। হাম প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশুদের জন্য ১০টি পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট- পিআইসিইউ বেড প্রস্তুত করা হয়েছিল। এক মাস ধরে রোগী বেড়েছে পিআইসিইউতে।
ডাক্তাররা জানিয়েছেন- গেল কয়েকদিন ধরে রোগী ভর্তি থাকে পিআইসিইউতে। ফলে নতুন রোগীর জায়গা দেয়ার ক্ষেত্রটি সংকোচিত হয়েছে। এদিকে- পিআইসিইউতে দেরিতে বেড পাওয়া কিংবা বেড পাওয়ার পরও অনেক রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হচ্ছে না। এজন্য দ্রুত চিকিৎসা পদ্ধতি চালু রাখতে হামের জন্য বিশেষায়িত শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আরও ১০টি হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট-এইচডিইউ ওয়ার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
গত দুইদিনে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছে ৫ শিশু। এ পর্যন্ত সিলেটে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ১১ জন শিশু মারা গেছে। হাসপাতালে থাকা রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেছেন- বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় অনেক শিশুই ক্রিটিক্যাল অবস্থায় চলে যায়। দ্রুতই তার পিআইসিইউ’র প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু ওসমানী হাসপাতালের পিআইসিইউতে জায়গা পাওয়ার জন্য অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। যখন পিআইসিইউ পাওয়া যায় তখন শিশুকে ভর্তি করলে জীবন রক্ষা হয় না।
তারা জানান- সিলেট বিভাগের হাম রোগীদের জন্য মাত্র ১০টি পিআইসিইউ। রোগীর সংখ্যা বেশি থাকায় পিআইসিইউ সংকটের কারণে গত দু’দিনে রোগী মৃত্যুর হার বেড়েছে। পিআইসিইউতে বেড সংকটের কথাও জানিয়েছেন সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন- হঠাৎ করে রোগী বেড়ে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
পিআইসিইউতে একজন রোগী ভর্তির পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত রোগীকে সরানো যায় না। কিছু সংকট আছে। তবে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য ইতিমধ্যে হামের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল শহীদ শামসুদ্দিনে ১০টি এইচডিইউ বেড চালু করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পিআইসিইউতে নেয়ার আগে রোগীকে এই ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দিয়ে সারিয়ে তোলা সম্ভব। তিনি বলেন- বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সিদ্ধান্ত পেলে এক সপ্তাহের মধ্যে এইচডিইউ ওয়ার্ড চালু করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান জানিয়েছেন- এইচডিইউ ওয়ার্ড চালু করলে যারা এই হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে যাবে তাদের সেখানে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হবে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন- তার হাসপাতাল হচ্ছে ১শ’ শয্যার। এরইমধ্যে রোগী ভর্তি হয়েছে আরও বেশি।
রোগীদের ম্যানেজ করে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। সিলেটের সিভিল সার্জন নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন- জেলার প্রতিটি উপজেলায় ২-৩টি বেডকে হাম আইসোলেশন বেড হিসেবে ঘোষণা দিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। ফলে সিলেট জেলার উপজেলা পর্যায় থেকে সিলেটের হাসপাতালমুখী রোগীর সংখ্যা কম। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা বলছেন- সিলেটের বাইরে থেকে আসা রোগীদের মধ্যে ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে বেশি।
সুনামগঞ্জ জেলা থেকে বেশি রোগী আসছে। এর কারণ তুলে ধরে তারা বলেন- হাওর ও গ্রামীণ এলাকায় হামের টিকা না দেয়ার প্রবণতার কারণে এমনটি ঘটছে। বর্তমানে যেহেতু টিকা দেয়া শুরু হয়েছে আগামী দু’মাসের মধ্যে রোগীর সংখ্যা কমে আসতে পারে। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে- সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন মোট ১৯০ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় নতুন করে কোনো রোগী শনাক্ত না হলেও এই সময়ে ৬৪ জন সন্দেহভাজন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
গতকাল পর্যন্ত বিভাগে মোট ৮০ জন ল্যাব-নিশ্চিত (কনফার্মড) হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। সন্দেহভাজন ১৯০ জন রোগীর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১০৭ জন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ১০ জন চিকিৎসাধীন আছেন। বাকিরা বিভাগের অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। ওসমানী মেডিকেলের উপ-পরিচালক জানিয়েছেন- হামের রোগী বাড়ছে সত্য।
এখন পর্যন্ত বিশেষায়িত হাসপাতালে রোগী ভর্তির সুযোগ থাকছে। যদি শামসুদ্দিনেও রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায় তাহলে ওসমানী মেডিকেলের ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের ৩৮টি বেড প্রস্তুত রয়েছে। ওখানে আইসোলেশন সেন্টার চালু করা যেতে পারে। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন- পিআইসিইউ’র সংকট দ্রুত সমাধান করা সম্ভব নয়। এর জন্য আনুষঙ্গিক সাপোর্টও লাগে। তবে সিলেটের রোগীর চিকিৎসা প্রদানের সুযোগ সরকারিভাবে এখনো রয়েছে।
