ইরানে ইসলামী বিপ্লব ও যুক্তরাষ্ট্রের জিম্মি সংকট

ফন্ট সাইজ:

১৯৭৯ সালে এক বিপ্লবের মধ্যদিয়ে ইরান থেকে বিদায় নেয় পাহলভি রাজবংশ। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। এই বিপ্লব ইসলামিক বিপ্লব নামে পরিচিত। এ সময়েই ইরানে মার্কিন জিম্মি সংকট শুরু হয় ৪ঠা নভেম্বর ১৯৭৯ সালে। তখন তেহরানে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে হামলা চালিয়ে কূটনীতিক ও বেসামরিক কর্মীসহ ৬৬ জন আমেরিকানকে জিম্মি করে ইরানিরা। তাদের মধ্যে ৫২ জনকে ২০শে জানুয়ারি ১৯৮১ সাল পর্যন্ত আটক রাখা হয়। ইরানি বিপ্লবের পরবর্তী মাসগুলোতে ‘ইমামের পথের অনুসারী মুসলিম ছাত্ররা’ দূতাবাস ভবনে হামলা চালিয়ে সেটি দখল করে নেয়। আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সমর্থনে তারা যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দাবি জানায়, যেন ইরানের রাজা মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ফেরত পাঠানো হয়। ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য কার্টার প্রশাসন তাকে আশ্রয় দিয়েছিল। হামলাকারীদের মধ্যে ছিলেন হোসেইন দেহঘান (পরবর্তীতে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী), মোহাম্মদ আলি জাফারি (পরবর্তীতে ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড করপসের প্রধান) এবং মোহাম্মদ বাঘেরি (পরবর্তীতে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ প্রধান)।

এই জিম্মি সংকট ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের নাটকীয় অবনতিতে বড় ভূমিকা রাখে। ৪৪৪ দিন পর, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আলজিয়ার্স চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এর সমাপ্তি ঘটে। এর আগেই ২৭শে জুলাই ১৯৮০ সালে মিশরের কায়রোতে পাহলভির মৃত্যু হয়।

আমেরিকার বিখ্যাত ম্যাগাজিন টাইম এই ঘটনাকে ‘প্রতিশোধ ও পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির জটিল জড়িয়ে পড়া’ হিসেবে বর্ণনা করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার এই জিম্মি ঘটনাকে ‘ব্ল্যাকমেইল’ বলে আখ্যা দেন। জিম্মিদের ‘সন্ত্রাস ও অরাজকতার শিকার’ বলে অভিহিত করেন।

অন্যদিকে, ইরানি বিপ্লবের সমর্থকদের কাছে এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া, যারা মনে করতো যুক্তরাষ্ট্র ইরানের রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনকে দুর্বল করার চেষ্টা করছিল। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা সাভাকের মাধ্যমে শাহ সরকার বিরোধীদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘন করছিল। কার্টার প্রশাসন পাহলভিকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় জিম্মিকারীরা এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানায়, যেখানে কূটনীতিক ও দূতাবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। ছয়জন আমেরিকান কূটনীতিক আটক এড়াতে পেরেছিলেন। তাদের ২৭শে জানুয়ারি ১৯৮০ সালে ‘কানাডিয়ান কেপার’ নামে পরিচিত অভিযানের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়। আলোচনার মাধ্যমে বাকি জিম্মিদের মুক্তি না হওয়ায়, ২৪শে এপ্রিল ১৯৮০ সালে কার্টার ‘অপারেশন ঈগল ক্ল’ নামে একটি সামরিক অভিযান অনুমোদন করেন। কিন্তু এটি ব্যর্থ হয় এবং এতে একজন ইরানি বেসামরিক নাগরিক ও আটজন আমেরিকান সেনা নিহত হন। এর ফলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইরাস ভ্যান্স পদত্যাগ করেন। ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইরাকে ইরান আক্রমণ শুরু করলে, আলজেরিয়ার মধ্যস্থতায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসতে রাজি হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কার্টারের প্রেসিডেন্সি পতনের অন্যতম কারণ ছিল। ১৯৮০ সালের নির্বাচনে তার বড় পরাজয়ের পেছনে ভূমিকা রাখে। আলজিয়ার্স চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই রোনাল্ড রিগানের শপথ গ্রহণের কয়েক মিনিট পর জিম্মিদের মুক্তি দেয়া হয়।

ইরানে এই সংকট খোমেনির মর্যাদা ও পশ্চিমবিরোধী ধর্মীয় নেতাদের রাজনৈতিক শক্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে আরও দুর্বল করে দেয়।

ইসলামী বিপ্লবের মধ্যদিয়ে ইরানে চালু হয় কট্টর শিয়া ইসলামপন্থি শাসন। ইরানের নাম রাখা হয় ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান। শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির রাজতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন ইসলামপন্থি ধর্মীয় নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি। তিনি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর একটি অংশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির পতনের মধ্যদিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে দেশটির ঐতিহাসিক রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।

১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-৬ এর সমর্থনে সংঘটিত অভ্যুত্থানে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তিনি এ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানিকে জাতীয়করণ করেছিলেন। এই অভ্যুত্থানের ফলে মোহাম্মদ রেজা পাহলভি পুনরায় সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন এবং ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।

১৯৬৩ সালে শাহ ‘হোয়াইট রেভ্যুলুশন’ নামে একটি আধুনিকায়ন ও ভূমি সংস্কার কর্মসূচি চালু করেন, যা সমাজের বিভিন্ন অংশ, বিশেষ করে ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। খোমেনি এই কর্মসূচির কড়া সমালোচক হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ১৯৬৪ সালে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। তবে পাহলভি ও খোমেনির মধ্যে আদর্শগত দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকায় ১৯৭৭ সালের অক্টোবরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়। তা ধীরে ধীরে নাগরিক প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নেয়। এতে কমিউনিস্ট, সমাজতান্ত্রিক ও ইসলামপন্থিরা অংশ নেয়।

১৯৭৮ সালের আগস্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় আসে। মোড় ঘুরে যায়। তখন ইসলামী কট্টরপন্থিদের দ্বারা সংঘটিত সিনেমা রেক্সে আগুনে প্রায় ৪০০ মানুষ নিহত হন। তবে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতো, এটি ছিল শাহের গোপন পুলিশ সাভাকের পরিকল্পিত ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অপারেশন। উদ্দেশ্য ছিল বিরোধীদের বদনাম করা এবং দমনপীড়নের অজুহাত তৈরি করা। এর ফলে দেশ জুড়ে ক্ষোভ ও আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সালের শেষ নাগাদ বিপ্লবটি একটি ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা পুরো দেশকে কার্যত অচল করে দেয়।

১৯৭৯ সালের ১৬ই জানুয়ারি শাহ দেশ ছেড়ে নির্বাসনে চলে যান এবং ক্ষমতা রিজেন্সি কাউন্সিল ও বিরোধী ঘরানার প্রধানমন্ত্রী শাপুর বখতিয়ারের হাতে ন্যস্ত করেন। ১লা ফেব্রুয়ারি সরকারের আমন্ত্রণে ইরানে ফিরে আসেন খোমেনি এবং তেহরানে অবতরণের সময় লক্ষ লক্ষ মানুষ তাকে স্বাগত জানায়। ১১ই ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং সশস্ত্র সংঘর্ষে গেরিলা ও বিদ্রোহী বাহিনী পাহলভি অনুগতদের পরাজিত করে। এরপর খোমেনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সেই শাসনের ধারাবাহিকতা এখনো চলছে ইরানে।

১৯৭৯ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৯৮ শতাংশ মানুষ ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত দিলে নতুন সরকার সংবিধান প্রণয়নের কাজ শুরু করে। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে খোমেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। এই বিপ্লবের পেছনে প্রধান চালিকা শক্তি ছিল শাহের শাসনব্যবস্থাকে দুর্নীতিগ্রস্ত, দমনমূলক এবং বিদেশি শক্তি, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হিসেবে দেখার ব্যাপক ধারণা, যা ইরানের সার্বভৌমত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। তবে অন্যদের মতে, এই বিপ্লবের সাফল্য ছিল অস্বাভাবিক। কারণ এতে যুদ্ধে পরাজয়, অর্থনৈতিক সংকট, কৃষক বিদ্রোহ বা সামরিক অসন্তোষ অনুপস্থিত ছিল। এটি এমন একটি দেশে সংঘটিত হয়, যেখানে তুলনামূলক সমৃদ্ধি ছিল। কিন্তু বিপ্লব খুব দ্রুত গভীর পরিবর্তন নিয়ে আসে এবং বিপুল সংখ্যক মানুষকে দেশত্যাগে বাধ্য করে, যা আজকের ইরানি প্রবাসী সমাজের বড় অংশকে সংগঠিত করেছে। এই বিপ্লব একটি পশ্চিমাপন্থি ধর্মনিরপেক্ষ ও স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে প্রতিস্থাপন করে একটি পশ্চিমবিরোধী ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে, যা ‘ভেলায়াত-এ ফকিহ’ (ইসলামী আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব) ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে এবং স্বৈরতন্ত্র ও সর্বাধিপত্যবাদের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।

ইসরাইল ধ্বংসকে একটি মূল লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করে বিপ্লব পরবর্তী ইরান এবং ওই অঞ্চলে সুন্নি নেতৃত্বের প্রভাব কমাতে শিয়া রাজনৈতিক শক্তির উত্থানকে সমর্থন দেয়। পাশাপাশি খোমেনিবাদী মতাদর্শ বিদেশে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা চালায়। এর পরবর্তী সময়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিতে শুরু করে এবং একটি ইরান নেতৃত্বাধীন শিয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালায়।

পটভূমি (১৮৯১-১৯৭৭)
বিপ্লবের পেছনে যে কারণগুলো তুলে ধরা হয় এবং যা এটিকে জনতাবাদী, জাতীয়তাবাদী এবং পরবর্তীতে শিয়া ইসলামী চরিত্র দিয়েছিল, সেগুলো হলো-
১. সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান,
২. ১৯৫৩ সালের ইরানি অভ্যুত্থান,
৩. ১৯৭৩ সালের তেলের আয় বৃদ্ধির ফলে প্রত্যাশার উত্থান,
৪. অতিরিক্ত উচ্চাকাঙক্ষী অর্থনৈতিক কর্মসূচি,
৫. ১৯৭৭-১৯৭৮ সালের স্বল্পমেয়াদি কিন্তু তীব্র অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে জনরোষ এবং
৬. পূর্ববর্তী শাসনব্যবস্থার অন্যান্য দুর্বলতা।
তৎকালীন সমাজের অনেক শ্রেণির মানুষ শাহের শাসনব্যবস্থাকে দমনমূলক, নির্মম, দুর্নীতিগ্রস্ত এবং বিলাসবহুল বলে মনে করতো। এই শাসনব্যবস্থায় কিছু মৌলিক কার্যকর ব্যর্থতাও ছিল, যা অর্থনৈতিক অচলাবস্থা, পণ্যের ঘাটতি এবং মুদ্রাস্ফীতির জন্ম দেয়। অনেকের কাছে শাহকে একটি অমুসলিম পশ্চিমা শক্তির, বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরশীল, এমনকি ‘পুতুল’ হিসেবেও মনে করা হতো, যার সংস্কৃতি ইরানের নিজস্ব সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছিল। একই সময়ে পশ্চিমা রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমের মধ্যেও শাহের প্রতি সমর্থন কমতে থাকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের প্রশাসনের সময়। কারণ শাহ ওপেকের তেলের দাম বৃদ্ধিকে সমর্থন করেছিলেন। কার্টার যখন মানবাধিকারভিত্তিক নীতি গ্রহণ করেন, যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র বা সহায়তা থেকে বঞ্চিত করার কথা বলা হয়, তখন অনেক ইরানি জনগণ সাহস পায় খোলামেলা চিঠি ও আবেদন প্রকাশ করতে, এই আশায় যে সরকারি দমনপীড়ন কমবে।

মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর রাজতন্ত্রকে ইসলাম ও খোমেনির নেতৃত্বে বিপ্লব আংশিকভাবে শিয়া ইসলামী পুনর্জাগরণের বিস্তারের ফল হিসেবেও বিবেচিত হয়। যদিও এটিকে প্রধানত একটি ধর্মীয় বিদ্রোহ হিসেবে বর্ণনা করা হয়, তবুও এই বিপ্লব জাতীয়তাবাদী লক্ষ্য, রাজনৈতিক জনতাবাদ এবং ধর্মীয় মৌলবাদের মিশ্রণ থেকেও জন্ম নিয়েছিল। এটি পাশ্চাত্যায়নের বিরোধিতা করে এবং খোমেনিকে শিয়া ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হতো, যেখানে শাহকে তার প্রতিপক্ষ, ঘৃণিত শাসক ইয়াজিদ প্রথমের ভূমিকায় দেখা হয়।
আরও কিছু কারণের মধ্যে ছিল শাহ শাসনের পক্ষ থেকে খোমেনির ইসলামপন্থি আন্দোলনকে অবমূল্যায়ন করা। তারা এটিকে মার্ক্সবাদী ও ইসলামী সমাজতান্ত্রিকদের তুলনায় কম হুমকি মনে করেছিল এবং ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীরাও ভেবেছিল খোমেনিবাদীদের সহজেই পাশে সরিয়ে রাখা যাবে।

রেজা শাহ (১৯২১-১৯৪১)
সাংবিধানিক বিপ্লবের পর সৃষ্ট অস্থিরতা ও বিশৃঙ্খলার সুযোগে পারস্য কসাক ব্রিগেডের কমান্ডার জেনারেল রেজা খান ১৯২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন। ১৯২৫ সালে তিনি শেষ কাজার শাহ আহমদ শাহকে অপসারণ করে একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং জাতীয় পরিষদের মাধ্যমে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করেন। এরপর তিনি ‘রেজা শাহ’ নামে পরিচিত হন এবং পাহলভি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা হন। তার শাসনামলে ব্যাপক সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার চালু করা হয়। তবে এই সংস্কারগুলোর অনেকগুলোই জনমনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে ইরানি বিপ্লবের পটভূমি তৈরি করে। বিশেষভাবে বিতর্কিত ছিল ইসলামী আইন বাতিল করে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ আইন প্রবর্তন, ঐতিহ্যবাহী ইসলামী পোশাক নিষিদ্ধ করা, নারী-পুরুষের বিচ্ছিন্নতা তুলে দেয়া এবং নারীদের মুখ ঢাকার নিকাব নিষিদ্ধ করা। জনসমক্ষে হিজাব পরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে পুলিশ জোরপূর্বক নারীদের চাদর খুলে ফেলতো এবং প্রতিরোধ করলে তা ছিঁড়ে দিতো। ১৯৩৫ সালে গোহরশাদ মসজিদে বিদ্রোহ দমন করতে গিয়ে ডজনখানেক মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হন। অন্যদিকে, রেজা শাহের উত্থানের সময় আবদুল-করিম হায়েরি ইয়াজদি কোম শহরে একটি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র (সেমিনারি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং ধর্মীয় শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। তবে তিনি এবং তার অনুসারী অন্যান্য ধর্মীয় নেতারা রাজনৈতিক বিষয়ে সরাসরি অংশ নেননি। ফলে রেজা শাহের শাসনামলে ধর্মীয় নেতৃত্বের পক্ষ থেকে ব্যাপক সরকারবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠেনি।

এ্যাংলো-সোভিয়েত আগ্রাসন ও মোহাম্মদ রেজা শাহ (১৯৪১-১৯৫১)
১৯৪১ সালে বৃটিশ ও সোভিয়েত বাহিনীর যৌথ আগ্রাসনে রেজা শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। কারণ তাকে নাৎসি জার্মানির ঘনিষ্ঠ মনে করা হতো। তার পরিবর্তে তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে শাহ হিসেবে বসানো হয়। ১৯৪৬ সালের জুন মাসে সোভিয়েত রেড আর্মি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ইরান কার্যত সোভিয়েত প্রভাবাধীন ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইরানে রাজনৈতিক অস্থিরতা তীব্র হয়ে ওঠে। শাহের সঙ্গে সোভিয়েতঘনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী আহমদ কাওয়ামের দ্বন্দ্ব, কমিউনিস্ট তুদেহ পার্টির উত্থান এবং ইরানি আজারবাইজান ও কুর্দিস্তানে সোভিয়েত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন দেশের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

মোসাদ্দেক এবং এ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি (১৯৫১-১৯৫২)
১৯০১ সাল থেকে এ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি (যা ১৯৩৫ সালে এ্যাংলো-ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি নামে পরিচিত হয়) ইরানের তেল উৎপাদন ও বিক্রয়ের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভোগ করতো। এটি ছিল বিশ্বের অন্যতম লাভজনক বৃটিশ ব্যবসা। অথচ অধিকাংশ ইরানি দারিদ্রে?্যর মধ্যে জীবনযাপন করছিল, যখন তাদের দেশের তেল থেকে অর্জিত সম্পদ বৃটেনকে বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করছিল। ১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক এই কোম্পানিকে দেশ থেকে বের করে দেয়া, তেলের সম্পদের ওপর জাতীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং বিদেশি প্রভাব থেকে ইরানকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেন। ১৯৫২ সালে মোসাদ্দেক কোম্পানিটিকে জাতীয়করণ করেন এবং জাতীয় নায়কে পরিণত হন। বৃটেন এতে ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে ‘চুরি’ করার অভিযোগ তোলে। তারা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ও জাতিসংঘে অভিযোগ করলেও সফল হয়নি। পরে তারা পারস্য উপসাগরে যুদ্ধজাহাজ পাঠায় এবং কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। কিন্তু মোসাদ্দেক বৃটিশ চাপের কাছে নতি স্বীকার করেননি।

বৃটেন সামরিক আগ্রাসনের কথা বিবেচনা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান সমর্থন না দেয়ায় তা সম্ভব হয়নি। তবে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেন। মোসাদ্দেক এই পরিকল্পনার খবর পেয়ে ১৯৫২ সালের অক্টোবরে বৃটিশ দূতাবাস বন্ধ করে দেন এবং সব বৃটিশ কূটনীতিক ও এজেন্টকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেন। এরপর পরিস্থিতি বদলে যায় যখন ১৯৫২ সালের নভেম্বরে ডুয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। শীতল যুদ্ধের ভয় এবং কমিউনিজমের আশঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রকে অবস্থান পরিবর্তনে প্ররোচিত করে। ১৯৫৩ সালের ২০শে জানুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন ফস্টার ডালেস এবং সিআইএ পরিচালক অ্যালেন ডালেস বৃটিশদের জানান যে, তারা মোসাদ্দেকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তাদের দৃষ্টিতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে জোটবদ্ধ নয় এমন যেকোনো দেশ সম্ভাব্য শত্রু। ইরানের বিশাল তেলসম্পদ, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং জাতীয়তাবাদী প্রধানমন্ত্রী-সব মিলিয়ে দেশটি কমিউনিজমে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা তৈরি করে। ‘দ্বিতীয় চীন’ হয়ে যাওয়ার ভয় ডালেস ভ্রাতৃদ্বয়কে আতঙ্কিত করেছিল। এর ফলেই ‘অপারেশন অ্যাজাক্স’ চালু হয়, যার মাধ্যমে ইরানের একমাত্র গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করা হয়।

আয়াতুল্লাহ খোমেনির উত্থান ও নির্বাসন (১৯৬৩-১৯৭৯)
বিপ্লব পরবর্তী নেতা, বারো ইমামবিশিষ্ট শিয়া আলেম আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি প্রথম রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ১৯৬৩ সালে। তখন তিনি শাহ এবং তার ‘হোয়াইট রেভ্যুলুশন’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। একই বছর খোমেনি শাহকে ‘দুর্ভাগা ও করুণ মানুষ’ আখ্যা দিয়ে বলেন যে, তিনি ইরানে ইসলাম ধ্বংসের পথে এগোচ্ছেন। এমন বক্তব্যের পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর সারা ইরানে তিনদিনব্যাপী বড় ধরনের দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। বিরোধী সূত্র অনুযায়ী পুলিশের গুলিতে প্রায় ১৫,০০০ মানুষ নিহত হন। যদিও বিপ্লববিরোধী সূত্রে বলা হয় নিহতের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩২ জন। আট মাস গৃহবন্দি থাকার পর খোমেনি মুক্তি পান এবং আবারো আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের জন্য কূটনৈতিক নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়টির তীব্র সমালোচনা করেন। ১৯৬৪ সালের নভেম্বরে তাকে পুনরায় গ্রেপ্তার করে নির্বাসনে পাঠানো হয়, যেখানে তিনি প্রায় ১৫ বছর কাটান (মূলত ইরাকের নাজাফ শহরে)। সেখান থেকেই বিপ্লবের পূর্বপর্যায় পর্যন্ত তার আন্দোলন চালিয়ে যান।

ইরানি বিপ্লবের মতাদর্শ
এই সময়টিকে অনেকেই ‘অসন্তুষ্ট নীরবতা’ বলে অভিহিত করেন। এই পর্যায়ে ইরানে একটি নতুন বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ শুরু হয়, যা শাহের পশ্চিমাপন্থি আধুনিকতার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের মতাদর্শিক ভিত্তি গড়ে তোলে। এই চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলো ছিল-
জালাল আল-আহমদের ‘ঘার্বজাদেগি’ ধারণা, যেখানে তিনি পশ্চিমা সংস্কৃতিকে এক ধরনের রোগ বা নেশা হিসেবে দেখান, যা দূর করা প্রয়োজন।
আলী শরিয়াতির ধারণা, যেখানে ইসলামকে তৃতীয় বিশ্বের মুক্তির একমাত্র পথ হিসেবে তুলে ধরা হয়। যা ঔপনিবেশিকতা, নব্য-ঔপনিবেশিকতা ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক।

মোর্তেজা মোতাহহারির মাধ্যমে শিয়া বিশ্বাসের নতুন ব্যাখ্যা, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, খোমেনি প্রচার করেন যে, অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, এমনকি শহীদ হওয়া শিয়া ইসলামের অংশ। তিনি মুসলমানদের আহ্বান জানান যেন তারা উদারপন্থি পুঁজিবাদ ও সাম্যবাদ উভয়ের প্রভাব প্রত্যাখ্যান করে। এই ধারণা থেকেই জন্ম নেয় বিপ্লবের বিখ্যাত স্লোগান: ‘না পূর্ব, না পশ্চিম- ইসলামী প্রজাতন্ত্র।’
জনসমক্ষে না থাকলেও, খোমেনি ভেলায়াত-এ ফকিহ (ইসলামী আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব) নামে একটি রাজনৈতিক মতবাদ গড়ে তোলেন। এই মত অনুযায়ী, মুসলমানদের এমনকি সকল মানুষের উচিত একজন শীর্ষস্থানীয় ইসলামী আইনজ্ঞের অধীনে শাসিত হওয়া বা তার তত্ত্বাবধানে থাকা। এটি ইসলামকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করবে এবং দারিদ্র?্য, অবিচার ও বিদেশিদের দ্বারা মুসলিম ভূমির শোষণ দূর করবে।
এই মতাদর্শ তার বই ইসলামিক গভর্নমেন্ট, মসজিদের খুতবা এবং গোপনে ছড়িয়ে দেয়া অডিও ক্যাসেটের মাধ্যমে তার সমর্থক নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়ে। যার মধ্যে ছিল ছাত্র, ধর্মীয় শিক্ষার্থী, আলেম এবং ঐতিহ্যবাহী বাজারভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।

বিরোধী দল ও সংগঠন
খোমেনির পাশাপাশি আরও বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। তার মধ্যে সাংবিধানিকতাবাদী ও উদারপন্থি গোষ্ঠী, যেমন মেহদি বাজারগানের নেতৃত্বে ইসলামিক ফ্রিডম মুভমেন্ট এবং অপেক্ষাকৃত ধর্মনিরপেক্ষ ন্যাশনাল ফ্রন্ট। তারা মূলত শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করতো এবং ১৯০৬ সালের সংবিধান পুনরায় কার্যকর করার পক্ষে ছিল, তবে তারা খোমেনির মতো শক্তিশালী ও সংগঠিত ছিল না।

কমিউনিস্ট গোষ্ঠী, বিশেষ করে তুদেহ পার্টি এবং ফেদাইন গেরিলা সংগঠন, সরকারি দমনপীড়নে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তবে ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত পতনে গেরিলাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সবচেয়ে শক্তিশালী গেরিলা সংগঠন ছিল পিপলস মুজাহেদিন। তারা বামপন্থি, ইসলামপন্থি ছিল এবং ধর্মীয় নেতাদের প্রভাবের বিরোধিতা করতো। ধর্মীয় নেতাদের মধ্যেও সবাই খোমেনির অনুসারী ছিলেন না। জনপ্রিয় আয়াতুল্লাহ মাহমুদ তালেগানি বামপন্থিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। আর প্রভাবশালী আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ কাজেম শরিয়তমাদারি প্রথমে রাজনীতি থেকে দূরে থাকলেও পরে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পক্ষে অবস্থান নেন।

খোমেনির কৌশল
খোমেনি এই বিভিন্ন বিরোধী শক্তিকে একত্রিত করার চেষ্টা করেন (যদিও নাস্তিক মার্ক্সবাদীদের তিনি অন্তর্ভুক্ত করতে চাননি)। তিনি শাহ সরকারের দুর্নীতি, বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক সমস্যার ওপর জোর দেন, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে অনেক স্পর্শকাতর বিষয়ে (যেমন-ধর্মীয় শাসনের পরিকল্পনা) প্রকাশ্যে বিস্তারিত বলেননি, যাতে বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভক্তি তৈরি না হয়। পরবর্তীতে শাহ পতনের পর, তার কিছু বিরোধী যারা তার ইসলামী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ায় এবং দমনপীড়নের শিকার হয়, তারা অভিযোগ তোলে যে, তাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। তবে বিপ্লবের সময় পর্যন্ত শাহবিরোধী ঐক্য মোটামুটি অটুট ছিল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন