জ্বালানি তেল নিয়ে থামছে না রংপুরে তেলেসমাতি কারবার। ঘটছে একের পর এক ঘটনা। বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা কেউ বলতে পারছে না। কেউ কেউ বলছেন তেলের সংকট, তবে তেল পাম্প মালিক রিয়াজ শহীদ শোভনের দাবি পেট্রোল ডিজেলের কোনো সংকট নেই।
তিনি বলেন, আমাদের স্বভাব আর মানসিকতার ক্রাইসিসের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। পেট্রোল পাম্প মালিক সূত্র জানায়, গত বছরের তুলনায় এ বছরে শুরু থেকে ভর্তুকি দিয়ে সরকার পাম্পে দ্বিগুণ পেট্রোল ডিজেল সরবরাহ করেছে। এরপরও সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর কারণ কি তা বুঝতে হবে।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা যায়, সাদুল্ল্যাপুর উপজেলার ট্রাক মালিক বাবু প্রামাণিকের মজুত করা পেট্রোলের পাত্রতে পড়ে তার তিন বছরের শিশু আশাফ প্রামাণিকের মৃত্যু হয়েছে রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে। এ ছাড়া রংপুরে অবৈধভাবে মজুত করা ৬৩০ লিটার ডিজেল জব্দসহ দুইজনকে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। এরা হলেন রংপুর নগরীর হাজীরহাট এলাকার পূর্ব জলকরিয়া গ্রামের হামিদ মিয়ার ছেলে হানিফ মিয়া ও লোকমান মিয়ার ছেলে শাহিন মিয়া।
বুধবার মধ্যরাতে পূর্বজলকরিয়া গ্রামে এ অভিযান চালানো হয়।
এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন র্যাব-১৩ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক বিপ্লব কুমার গোস্বামী। এতে বাড়িতে অবৈধভাবে মজুত রাখা ৬৩০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করে র্যাব। এ সময় আসামি হানিফ ও শাহিনকে দুই মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওদিকে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় জ্বালানি তেল অবৈধভাবে মজুত ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগে গত শনিবার সবুজ মিয়া নামে এক ব্যবসায়ীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। উপজেলার বেতগাড়ি, আলমবিদিতর ও বড়বিল ইউনিয়নের বিভিন্ন বাজারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তারের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। এ সময় বড়বিল ইউনিয়নের ‘সবুজ স্টোর’-এর মালিক সবুজ মিয়ার বাড়িতে অভিয়ান চালিয়ে মজুত রাখা জ্বালানি তেল জব্দ করাসহ জরিমানা করা হয়।
সরজমিন ফিলিং স্টেশনগুলো ঘুরে দেখা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষায় মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে গ্রাহকরা। কখন সিরিয়াল আসবে। এ অপেক্ষা শুধু জ্বালানি তেলের জন্য। তেল না পেয়ে অনেক স্থানে হাতাহাতি-মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। তেল নিতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষক মেহেদী হাসানের (৩৩) হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রংপুর পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি আজিজুল ইসলাম মিন্টু ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা সোহরাব চৌধুরী টিটু বলেন, সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে তেল সরবরাহ করা সত্ত্বেও কেন তেল সংকট তা খতিয়ে দেখতে হবে। প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তারা আরও জানান, জ্বালানি তেল রংপুরসহ সারা দেশে এখন সোনার হরিণ। চলমান তেল সংকট থেকে উত্তরণে প্রয়োজনের বেশি তেল সংগ্রহ না করার আহ্বান জানিয়েছে ডিপোগুলো।
অপরদিকে নিরাপত্তার শঙ্কায় তেলের ডিপোগুলোতে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
ছালেক ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা এহসানুল হক সুমন বলেন, এতো চেষ্টা করেও আর তেল ভরাতে পারছি না। দু’দিন তেল না পেয়ে ঘুরে গেছি। কাজের প্রয়োজনে রংপুর নগরী থেকে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যেতে হয়। কিন্তু মোটরসাইকেলে তেল না থাকায় সমস্যায় পড়ে গেছি। মনিরুজ্জামান মনির বলেন, অনেক তেল পাম্পে তেল থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ বলছে তেল নাই। এটা কোনো কথা। তেলের কি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এ সকল ফিলিং স্টেশনগুলোতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা উচিত। এদিকে গঙ্গাচড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জেসমিন আক্তার বলেন, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত দামে পেট্রোল বিক্রি কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। বাজার স্থিতিশীল রাখতে আমাদের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। মেঘনা ডিপোর ইনচার্জ জাকির হোসেন পাটোয়ারী বলেন, রংপুর জেলায় প্রায় ৮০টি তেলের পাম্প রয়েছে। আগে পাম্পগুলো সপ্তাহে দু’বার পেট্রোল-অকটেন নিলেও বর্তমানে প্রতিদিনই পাম্প থেকে চাহিদা আসছে। যা ইতিপূর্বে এমনটি চাহিদা ছিল না।
