তিস্তা পাড়ের কান্না

তিস্তা পাড়ের কান্না

ফন্ট সাইজ:

চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতে চাইবে না। কি নিদারুণ কষ্ট তিস্তা পাড়ের জনজীবনে। কতোটাই পিছিয়ে পড়েছে এখানকার জীবমান। কখনো বানের পানিতে ভাসে আবার কখনো খাঁ খাঁ রোদে পুড়ে ছারখার। যতদূর চোখ যায় ধুধু বালুচর। আর তার মাঝেই বেঁচে থাকার বিরামহীন লড়াই। তিস্তা পাড়ের এই করুণ কাহিনী কখনো কখনো আরও বেদনা বিধুর হয়ে আসে তিস্তা পাড়ের জনজীবনে। উজানের বানে ভাসে গ্রামের পর গ্রাম। তলিয়ে যায় মাইলের পর মাইল ফসলের ক্ষেত। পরিবার-পরিজন নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে হয় হাজার হাজার বানভাসী মানুষকে। তখন ঠাঁই নেয়ার একমাত্র সম্বল হয়ে দেখা দেয় তিস্তা ডানতীর রক্ষা বাঁধ। মানুষ আর গবাদিপশু মিলে একাকার অবস্থা। দুর্গম বালুচরে জিয়ে থাকা স্বপ্ন নিমিষেই বিষাদে পরিণত হয় বানের পানিতে।

এ স্বপ্ন ভাঙা দুঃখ-কষ্ট-কান্না প্রতি বছরের। আর এই ক্ষণে ক্ষণে ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন নিয়েই খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছেন তিস্তা পাড়ের হাজার হাজার মানুষ। এভাবেই বেড়ে উঠছে এখানকার শত শত শিশু। তিস্তা পাড়ের তেমনি একটি ইউনিয়ন টেপা খড়িবাড়ি। ডিমলা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের এ ইউনিয়নটির মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে খরস্রোতা তিস্তা। আর এই তিস্তা নদীই আবার ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। নদীর দক্ষিণ পাড়ে ৫টি এবং উত্তর পাড়ের ৪টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত টেপা খড়িবাড়ি ইউনিয়নের আয়তন প্রায় ৩১.৭১ বর্গ কিলোমিটার। এ ইউনিয়নে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের বসবাস। এখানে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন ১৫ হাজার ৮০২ জন। যার একটি বড় অংশের বসবাস আবার নদীর উত্তর পাড়ে।

তিস্তা নদী বেষ্টিত এ ইউনিয়নের দক্ষিণ পাড়ে থাকা জনগোষ্ঠী মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও নদীর উত্তর পাড়ে থাকা ৪টি ওয়ার্ডের মানুষের কষ্টের যেন শেষ নেই। খরা-বন্যা-বান সবসময়ই তাদের ছায়াসঙ্গী। শুষ্ক মৌসুমে কষ্ট কিছুটা লাঘব হলেও বান-বন্যায় দুর্ভোগের শেষ থাকে না। ঘরের দুয়ার থেকে বানের পানি বেয়ে পৌঁচ্ছাতে হয় গন্তব্যে। দাপ্তরিক কোনো কাজে উপজেলা সদর ডিমলা কিংবা দক্ষিণ পাড়ে থাকা ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে আসতে হলে কয়েক মাইল পথ পায়ে হেঁটে তার পর নৌকায় নদীর পার হয়ে আবার কয়েক মাইল পথ পায়ে হেঁটে আসতে হয়। নদীর উত্তর পাড়ে থাকা কলেজ শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, তিস্তা পাড়ে জন্ম যেন আমাদের আজন্ম পাপ। পৃথিবীর আলো-বাতাসে আসার আগেই মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় আমাদের কষ্টের শুরু হয়। নদীর উত্তর পাড়ে বসবাসকারী স্কুল শিক্ষিকা খাদিজা বেগম বলেন, বলে-কয়ে কি এত কষ্ট বোঝানো যায়। আমাদের কষ্ট দেখতে চাইলে বানের সময় একবার তিস্তা পাড়ে আসুন। একই অভিমত ব্যক্ত করেন, প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক শাহীন ইসলাম।

তিনি বলেন, কষ্টের কথা কি বলবো ভাই। আমাদের একটি নাগরিকত্ব কিংবা জন্ম সনদ আনতেই গলদঘর্ম অবস্থা। ৮-১০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। টেপা খড়িবাড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী সুমি আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, অনেক কষ্ট করে আমাদের স্কুলে আসতে হয়। কখনো তপ্ত রোদে ধুধু বালুর উপর দিয়ে, কখনো বা জমির আইল ধরে, কখনো বা নৌকা বেয়ে স্কুলে আসতে হয়। বর্ষা এলে আমাদের আর স্কুলে যাওয়া হয় না। ডিমলা সদরে যেতে হলে আমাদের মাইলে পর মাইল পায়ে হেঁটে নদী পার হয়ে যেতে হয়।

৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, সামান্য কাজে ইউনিয়ন পরিষদ যেতেই আমাদের কষ্টের শেষ থাকে না। দিন বয়ে যায়। একই কথা বলেন, ৪নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ওসমান গণি ও ৫নং ওয়র্াডের নজরুল ইসলাম। তারা বলেন, বাচ্চাদের জন্মসনদ, নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা নিতে ইউনিয়ন পরিষদে যেতে আমাদের মাইলের পর মাইল ধুধু বালুচর আর নদী পার হয়ে দক্ষিণ পাড়ে যেতে দিন শেষ হয়ে যায়। আমাদের এই কষ্ট আর ভোগান্তি দেখার যেনো কেউ নেই। সরকার আসে সরকার যায় আমাদের দুঃখ-কষ্ট-কান্না ছায়াসঙ্গী হয়ে থেকে যায়। তাই তিস্তা নদীর উত্তর পাড়ের হাজার হাজার মানুষের শিক্ষা-চিকিৎসাসহ জীবনমান ও এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে একটি নতুন ইউনিয়ন পরিষদ গঠনের দাবি তাদের।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন