যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধের কারণে জ্বালানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথটিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা শুরু হয়েছে। শান্তি ফিরলে প্রণালিটি মাইনমুক্ত করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে একাধিক দেশ। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান পাল্টা জবাবে প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়। পরে ঘোষণা দেয়, এই পথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি নেয়া হবে।
এ মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করে তাদের তেল রপ্তানি বন্ধের চেষ্টা চালায়। ইরানি বন্দর থেকে বের হওয়া ৩০টিরও বেশি জাহাজকে ফিরিয়ে দেয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলেও হরমুজ প্রণালি এখনো উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে, যা আলোচনা নতুন করে শুরু করায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইরানের সামরিক বাহিনী বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ বজায় রাখে, তাহলে তারা জবাব দেবে। তারা এটিকে ডাকাতি ও জলদস্যুতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবির এক বিবৃতিতে ইরানের সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ড খাতাম আল-আনবিয়া জানিয়েছে, অবৈধভাবে অনুপ্রবেশকারী মার্কিন সামরিক বাহিনী যদি এই অঞ্চলে অবরোধ, ডাকাতি ও জলদস্যুতা চালিয়ে যায়, তবে তাদের নিশ্চিত থাকতে হবে যে তারা ইরানের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর জবাবের মুখে পড়বে। তারা আরও যোগ করে, আমরা প্রস্তুত ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শত্রুর আচরণ ও গতিবিধি নজরে রাখছি।
অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন বলেছেন, তিনি হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর প্রচেষ্টায় মনোযোগ দিচ্ছেন। এর আগের দিন টোটালএনার্জিসের প্রধান সতর্ক করেছিলেন, ইরান যুদ্ধ কয়েক মাস ধরে চললে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখা দিতে পারে।
এথেন্সে গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিৎসোটাকিসের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে ম্যাক্রন বলেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেই অনেক সময় আতঙ্ক তৈরি হয়, যা নিজেই সংকট ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সম্পূর্ণভাবে প্রণালিটি খুলে দেয়া, যাতে কোনো টোল ছাড়াই নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা যায়। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে। টোটালএনার্জিসের সিইও প্যাট্রিক পুইয়ানে শুক্রবার প্রণালিটি পুনরায় চালুর আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে এই প্রণালিতে চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ইরান কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ জারি করেছে। এক ডজনের বেশি দেশ জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুকূলে এলে ফ্রান্স ও বৃটেনের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক মিশনে যোগ দিয়ে তারা এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে কাজ করবে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার মিত্রদের সহায়তা প্রয়োজন নেই।
ম্যাক্রন শনিবার বলেন, আমরা সবাই একই নৌকায় আছি, এটা আমাদের পছন্দের নৌকা নয়। আমরা ভূরাজনীতির শিকার এবং কয়েক মাস আগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধেরও শিকার।
তুরস্ক ও জার্মানিও হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য মিশনে আগ্রহ দেখিয়েছে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির পর আঙ্কারা প্রণালিতে মাইন অপসারণ কার্যক্রমে অংশ নেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। লন্ডনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, কোনো চুক্তির পর একটি কারিগরি দল প্রণালিতে মাইন অপসারণের কাজ শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি এটিকে মানবিক দায়িত্ব হিসেবে ইতিবাচকভাবে দেখার কথা জানান। তিনি বলেন, এই শর্তে তুরস্কের অংশগ্রহণে কোনো সমস্যা নেই।
তবে ভবিষ্যতে যদি কোনো কারিগরি জোট নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। ফিদান আরও বলেন, তিনি মনে করেন পাকিস্তানে পরবর্তী দফার আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়গুলো সমাধান হতে পারে। অন্যদিকে জার্মানির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র এএফপিকে জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শেষে সম্ভাব্য মিশনের জন্য জার্মানি শিগগিরই ভূমধ্যসাগরে একটি মাইনসুইপার পাঠাবে।
জার্মান নৌবাহিনীর ‘ফুলডা’ জাহাজটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মোতায়েন করা হবে বলে তিনি জানান। এর লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় আন্তর্জাতিক জোটে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান অবদান রাখা।
মাইনসুইপার হলো বিশেষায়িত জাহাজ, যা সমুদ্রের মাইন শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করতে ব্যবহৃত হয়। প্রায় ৪৫ জন ক্রুসহ জাহাজটি মোতায়েন থাকবে। তবে প্রণালিতে কোনো মিশনে অংশ নেয়া হবে শুধু স্থায়ীভাবে সংঘাতের অবসান ঘটার পর এবং জার্মান পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে।
