সেবা পেতে মানববন্ধন

সেবা পেতে মানববন্ধন

ফন্ট সাইজ:

বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতাল। উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের শেষ ভরসাস্থল। কিন্তু সেই ভরসার প্রদীপ এখন নিভু নিভু। হাসপাতালের সেবার মান এখন তলানিতে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ বহু বছরের পুরনো। কিন্তু ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর মানুষ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছিল, স্বাস্থ্যখাতে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যাচ্ছে না। বরং সিন্ডিকেট আর অব্যবস্থাপনা আরও জেঁকে বসেছে। হাসপাতালের ভেতরে পা দিলেই চোখে পড়ে এক হাহাকার। কর্তব্যরত ডাক্তারদের বড় একটি অংশ সরকারি দায়িত্ব পালনে চরম উদাসীন। অভিযোগ রয়েছে, ডাক্তাররা হাসপাতালের ডিউটি কোনোরকম দায়সারাভাবে শেষ করেই ছোটেন বাইরের প্রাইভেট ক্লিনিকে। হাসপাতালের আশপাশে এবং মূল শহরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা ক্লিনিকগুলো এখন শজিমেকের ডাক্তারদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। সরকারি বেতন আর সুবিধা ভোগ করলেও তাদের মূল মনোযোগ থাকে ওই সব ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসা দেয়ায়।

ফলে সরকারি হাসপাতালে আসা অসহায় রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা ডাক্তারদের দেখা না পেয়ে স্ট্রেচার বা বারান্দায় ধুঁকতে থাকেন। অথচ সেই ডাক্তারদেরই আবার ক্লিনিকে গেলে খুব তৎপর দেখা যায়। এই দ্বিচারিতা এখন ওপেন সিক্রেট। গত রমজানে লিভার সমস্যা নিয়ে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন পাশের জেলা গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা লুৎফর রহমান মণ্ডল। এক মাসেরও বেশি সময় তিনি ভর্তি ছিলেন হাসপাতালে। একটি অপারেশন করার পর আইসিইউতে রাখা জরুরি হয়ে ওঠে। তার ছেলে নুর আলম মণ্ডল জানান, চলতি মাসের ৭ই এপ্রিল আমার পিতার অবস্থা খুব খারাপ হয়ে ওঠে। ডিউটি ডাক্তারদের কাছে গেলে তারা জানায়, অক্সিজেন লেভেল ৬৫’র নিচে নেমে গেছে। দ্রুত আইসিইউতে নিতে হবে। ওয়ার্ড থেকে তাকে আইসিইউতে পাঠানোর পরামর্শ দেন ডাক্তাররা। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আইসিইউতে যোগাযোগ করলে তারা বলেন, এখানে মেশিন ফাঁকা নেই।

সরজমিন আইসিইউতে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র চারটি মেশিন চালু আছে। বাকিগুলো সব নষ্ট। ওইদিন দুপুরেই বীর মুক্তিযোদ্ধা আইসিইউ সার্পোট না পেয়ে মারা যান।
গতকাল গাবতলী উপজেলার ফজিলা বেগম একটি মানববন্ধনে উপস্থিত হয়ে বলেন, তার ২২ বছরের ছেলে বাইক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হলে তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করাই। তারপর সেখানকার একজন ডাক্তারের নাম উল্লেখ করে বলেন, সেই ডাক্তার হাসপাতালে ছেলের অপারেশন হবে বলে দেন। পরে ওই ডাক্তার সোনার দেশ নামের একটি ক্লিনিকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে অপারেশন করেছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সাধারণ মানুষ একটি সুন্দর এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চেয়েছিল।

বিশেষ করে স্বাস্থ্যখাতে আমূল পরিবর্তন ছিল সময়ের দাবি। কিন্তু শজিমেক হাসপাতালের বর্তমান চিত্র মানুষকে আবারো আশাহত করেছে। ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, বাথরুমের দুর্গন্ধ আর দালালদের দৌরাত্ম্যে হাসপাতালটি এখন নিজেই ‘রোগী’ হয়ে পড়েছে। একদল ডাক্তারের ক্লিনিকনির্ভর বাণিজ্যের কারণে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সরকার বদলেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে রাজপথের কর্মসূচিতে। শজিমেক হাসপাতালের এই চরম অব্যবস্থাপনা, সেবার মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন সংকট সমাধানের দাবিতে শনিবার শহরের সাতমাথায় এক বিশাল মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নাগরিকদের জন্য আমরা’ এই কর্মসূচির আয়োজন করে। মানববন্ধনে বক্তারা হাসপাতালের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হাসপাতালের ভেতর মানুষের থাকার পরিবেশ নেই। তারা অবিলম্বে ১ হাজার ২০০ শয্যার এই হাসপাতালটিকে ২ হাজার শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানান।

এ ছাড়া, বগুড়ায় একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবিও জোরেশোরে ওঠে এই কর্মসূচি থেকে। আয়োজকরা আক্ষেপ করে বলেন, উত্তরবঙ্গের এই প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্রে আইসিইউ, সিসিইউ, পিসিইউ, ডায়ালাইসিস এবং কেমোথেরাপিসহ জরুরি সব সরঞ্জাম হয় নষ্ট, নয়তো অপর্যাপ্ত। গরিব রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে না। ডাক্তারদের অবহেলা আর সরঞ্জামের সংকটে হাসপাতালটি এখন রেফারাল সেন্টারে পরিণত হয়েছে। তারা দ্রুততম সময়ে এসব চিকিৎসা সরঞ্জাম বৃদ্ধি এবং ডাক্তারদের হাসপাতালে উপস্থিতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রতিদিন হাজারো মানুষ এখানে আসে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে রোগীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। নাগরিকদের মৌলিক এই অধিকার নিশ্চিতে প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। ডাক্তাররা যদি হাসপাতালের ডিউটি রেখে ক্লিনিকে সময় দেয়া বন্ধ না করেন, তবে ভবিষ্যতে আরও কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে।

মানববন্ধন কর্মসূচিতে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নাগরিকদের জন্য আমরা’র সভাপতি লুৎফর রহমানের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আবু মুসার পরিচালনায় বক্তব্য রাখেন- বগুড়া প্রেস ক্লাবের সহ-সভাপতি মির্জা সেলিম রেজা, নির্বাহী সদস্য ও দৈনিক ইনকিলাবের সিনিয়র সাংবাদিক মহসিন আলী রাজু, সংগঠনের উপদেষ্টা সদস্য মাহবুবর রহমান ছোটন, গোলাম ফারুক সোহেল, সহ-সভাপতি এডভোকেট জুলফিকার আলী ভুট্টো, যুগ্ম সম্পাদক মাসুম মিয়া, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস সালাম, দপ্তর সম্পাদক সাইদুর রহমান সাজু, আজিজুল হক, আব্দুল হান্নান, ইসমাইল হোসেন পাতা, সাজ্জাদুর রহমান সুজা, সুমাইয়া আক্তার সুমি, দিলরুবা ইয়াসমিন, সামিয়া আক্তার আইভি, শিউলী বেগম প্রমুখ।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন