একসময় যে পাড়াবন ছিল প্রাণের আশ্রয়, আজ তা পরিণত হয়েছে নিঃশব্দ ধ্বংসস্তূপে। আলীকদমের তৈন রেঞ্জের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ২৯০ মাংগু মৌজার ব্যাঙ ঝিরি একটি নাম, যা একসময় সবুজের প্রতীক ছিল; এখন তা বন নিধনের নির্মম সাক্ষী। ঘন সবুজে মোড়া পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া, আদুই পাড়াসহ আশপাশের গ্রামের বনভূমি ছিল জীববৈচিত্র্যের এক উর্বর ভাণ্ডার। শত শত প্রজাতির বৃক্ষ, বন্যপ্রাণী আর পাখির কোলাহলে মুখর ছিল পুরো এলাকা। কিন্তু আজ সেই বন যেন নির্বাক কেবল পড়ে আছে কাটা গাছের গুঁড়ি, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ডালপালা আর ধ্বংসের করুণ চিহ্ন। অভিযোগ উঠেছে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার নীরব সহযোগিতায় সংঘবদ্ধ চক্র দিনের পর দিন নির্বিচারে উজাড় করে চলেছে এই বনাঞ্চল। বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা সংস্থাই যদি হয়ে ওঠে বন ধ্বংসের নীরব দর্শক, তাহলে এই বিপর্যয়ের দায় নেবে কে?
সরজমিন দেখা যায়, থানচি-আলীকদম সড়কের সাড়ে ২৩ কিলো আর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার দূরের চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মাংগু মৌজা। সেখানে পামিয়া ম্রো পাড়া, তন্তুই পাড়া নামচাক পাড়া, কাকই পাড়া, আদুই পাড়াসহ হাজারো ম্রো জাতিগোষ্ঠীর বসবাস। তাদের খাওয়ার প্রধান পানির উৎস সেই ব্যাঙঝিরি। অথচ ওই ঝিরিতে পানি দূরের কথা প্রায় ২শ’ একর আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলছে এই বন উজাড় কর্মযজ্ঞ। এছাড়া রূপসী পাড়া ইউনিয়নের আরও কয়েকটি পাড়ার মানুষও একই পানির উৎস ব্যবহার করতো। বন উজাড় ও ঝিরির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখন মারাত্মক পানি সংকট দেখা দিয়েছে ঐসব এলাকায়।
প্রাকৃতিক বন ধ্বংস করে কাঠ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বান্দরবানের দুর্গম আলীকদম-থানচি সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রভাবশালী সিন্ডিকেট মো. ইসমাইল এর বিরুদ্ধে। তার সহযোগী হিসেবে লংলেইন ম্রোর নামও এসেছে। এসব কাঠের একটি অংশ ‘জোত পারমিট’-এর কাগজ দেখিয়ে বৈধতার আড়ালে পাচার করা হচ্ছে। অন্য অংশ স্থানীয় অবৈধ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে বিক্রি করা হচ্ছে। আর এসবের পিছনে বনাঞ্চল ধ্বংসাত্মক কাজে নেমেছেন আলীকদম পান বাজারের বাসিন্দা মো. ইসমাইল প্রকাশ লাল ইসমাইল। দীর্ঘ দুই বছর ধরে অবৈধভাবে পাহাড় কেটে রাস্তা নির্মাণ, ঝিরির পানিপ্রবাহ বন্ধ এবং শতবর্ষী মাতৃগাছ কেটে নেওয়ার ফলে পুরো এলাকার জীববৈচিত্র্য আজ হুমকির মুখে পড়েছে। আলীকদম-থানচি সড়কের ১৭ কিলোমিটার অংশ থেকে ১ঘণ্টা হেঁটে গেলেই চোখে পড়ে পোলা ব্যাঙঝিরি এলাকায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র। ঝিরির স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে বিশাল পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে ট্রাক চলাচলের উপযোগী রাস্তা। এই রাস্তা ব্যবহার করে ট্রাক দিয়ে নিয়মিত পরিবহনের মাধ্যমে কাঠ পাচার করা হচ্ছে। রাস্তার দুই পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে বিশাল আকৃতির গাছের গুঁড়ি, যেগুলোর অনেকগুলোর দৈর্ঘ্য ৬০ থেকে ১০০ ফুট এবং প্রস্থ ১০ থেকে ১৫ ফুট পর্যন্ত। অনেক গাছ অর্ধেক কেটে রাখা হয়েছে।
আদুই পাড়ার কার্বারী কামপ্লাত ম্রো বলেন, এই ঝিরির পানির ওপর ৭-৮টি পাড়া নির্ভরশীল। কিন্তু এখন আমরা পানির জন্য হাহাকার করছি। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
নামচাক ম্রো পাড়ার মেন রাও ম্রো বলেন, আগে এই বনে হরিণ, ভালুক, বন্য শূকর ছিল। এখন বন নেই, প্রাণীও নেই। গত দু’বছর ধরে শুধু গাছ কেটে যাচ্ছে ইসমাইল নামে এক ব্যক্তি। তিনি আরও বরেন, ব্যাঙ ঝিরিতে দু’বছর আগে পানি প্রবাহ ছিল। কেননা সেখানে তখন বহুপ্রজাতি বা শতবর্ষী গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। গাছের ছায়া আর শিকড়ে গোড়ায় বা পাথরে গর্তে বিভিন্ন প্রজাতির শামুক, কাঁকড়াসহ খাবার ছিল। সেটির সঙ্গে গভীর জঙ্গল হওয়াতেই বানর, হরিণসহ বিভিন্ন পাখির ডাক শোনা যেত। কিন্তু এখন সেসব গাছ কেটে ফেলেছে। এখন সেই বনাঞ্চল ধুধু মরুভূমি।
পামিয়া পাড়াবাসী রেংপু ম্রো নিজের ভাষায় বলেন, ব্যাঙ ঝিরি আগা থেকে শেষে মাথা পর্যন্ত গত দুই বছর ধরে গাছ কাটা শুরু করেছে। এর জন্য গ্রামবাসী পানি সংকটে পড়েছে। বহু বছর ধরে দাঁড়িয়ে থাকার বিভিন্ন প্রজাতির গাছের গায়ে শুধু মেশিন করাতের দাগ। আর এই ক্ষতবিক্ষত দাগ বলে দিচ্ছে সবুজের বনাঞ্চল ধ্বসের পথে। গাছ পরিবহন করতে পাহাড়গুলোকে কেটে কাঁচা রাস্তা বানানো হয়েছে। সে রাস্তা দিয়ে দিনরাত গুঁড়ি করা গাছগুলো টেনে আলীকদমে নেয়া হচ্ছে।
গাছ কাটার মাঝি ইসমাইল বলেন, আগে দুই মাস এখানে এসে গাছ কেটেছেন। এরপর গিয়ে আবার এসেছেন। গাছ পরিবহন করতে দু’টি গাড়ি রয়েছে। এখানে কড়ই, চাপালিশ, গুলগুইট্টা, গামারিসহ অনেক গাছ কাটা হয়েছে। এসব গাছের সওদাগর আলীকদম পান বাজারে ইসমাইল।
স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী বনখেকোদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে এই চক্র। লামা তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা খন্দকার আরিফুল ইসলাম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় বন বিভাগের কার্যক্রম নেই, তবে অবৈধ কাঠ পাচার হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম জানান, এ বিষয়ে আমি অবগত নই। প্রয়োজনে পুলিশ ফোর্স নিয়ে সরজমিন তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
