পদ্মা নদীর ভাঙনে জর্জরিত মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলা। প্রতি বছর নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছেন হাজারো মানুষ। বিলীন হচ্ছে সরকারি নানা স্থাপনা। গত বছরেও তীব্র নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়েছেন চরাঞ্চলের এক হাজার পরিবার। এমন ভাঙনকবলিত এলাকায় নিয়মিত বালুমহাল ইজারা ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের জন্য এক ‘আতঙ্ক’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপজেলার চরাঞ্চলের তিনটি ইউনিয়নসহ পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা আছেন ভাঙন আতঙ্কে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র এক রিপোর্টে হরিরামপুরকে পদ্মা নদীর সবচেয়ে ভাঙনপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, ১৯৬৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হরিরামপুর অঞ্চলে ৬৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়েছে। যা যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের সমান। স্থানীয় সূত্রে ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরেও ভয়াবহ নদীভাঙনে চরাঞ্চলের প্রায় এক হাজার পরিবার বসতভিটা হারিয়েছেন। বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। চলতি বছরেও নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন আতঙ্কে আছেন উপজেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ। হরিরামপুরে চতুর্থবারের মতো এ বছর বালুমহাল ইজারা দেয়া হয়েছে। ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য লেছড়াগঞ্জ বালুমহাল ইজারা পেয়েছে ‘খান এন্টারপ্রাইজ’, যার মালিক মো. বিল্লাল খান।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গতবছর তীব্র ভাঙনের শিকার হওয়ার পরে এ বছরও বালুমহাল ইজারা দেয়ায় অসন্তুষ্ট চরাঞ্চলের মানুষ। তাদের দাবি, বিগত সব বছরেই বালুমহালের নির্ধারিত সীমানা উপেক্ষা করে বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হয়েছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে একাধিকবার প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। প্রশাসনও ব্যবস্থা নিয়েছে। তারপরেও সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন ফেরানো যায়নি। লেছড়াগঞ্জের বাসিন্দা মোহাম্মদ হোসেন বলেন, পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হরিহরদিয়া, কবিরপুর ও জয়পুর এলাকার অনেকে ভাঙন আতঙ্কে ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিছুক চরের এক কৃষক বলেন, পদ্মা নদীতে বালুমহাল শুরু হওয়ার পর থেকে ভাঙন কয়েকগুণ বাড়ছে। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, গত বছর পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে ১২০০ পরিবার বসতবাড়ি হারিয়েছেন। চলতি বছরেও নদীতে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড় ভাঙছে। বালুমহাল ও সীমানার বাইরে অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে জানিয়েছি। উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এবং চরাঞ্চলের বাসিন্দা হান্নান মৃধা বলেন, চরের মানুষজন কৃষিনির্ভর। প্রতি বছর মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, বাজার, ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে ভেঙে যায়। বালুমহালের নির্দিষ্ট সীমানায় বালু উত্তোলন করলে চরের এত ক্ষতি হয় না।
কিন্তু তারা বালুমহালের নির্ধারিত সীমানার বাইরে গিয়ে যেখানে থেকে বালু তুললে তাদের লাভ হয় তারা সেখান থেকে বালু তুলে। মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, নদী থেকে নির্ধারিত স্থান ব্যতীত যদি বালু তোলা হয়, তাহলে নৌ-যোগাযোগ চলাচলে বিঘ্ন হয় এবং নদীভাঙনের আশঙ্কা থাকে। তবে, পদ্মা নদীতে একটা নির্ধারিত চ্যানেলে যদি প্রতি বছর খনন করা হয় তাহলে নদীর নাব্যতা ঠিক থাকবে এবং সরকারি রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ এবং সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের অনাপত্তি নিয়েই বালুমহাল ঘোষণা করা হয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সুফল হচ্ছে সরকারি রাজস্ব আদায়। বালুমহালের ইজারাদারকে সীমানা বুঝিয়ে দেয়া হবে। সীমানার বাইরে থেকে বালু উত্তোলন করা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
