সরাইল পাবলিক লাইব্রেরির ২৫০০ বই গায়েব

সরাইল পাবলিক লাইব্রেরির ২৫০০ বই গায়েব

ফন্ট সাইজ:

প্রায় ৪৬ বছর আগে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ও স্থানীয়দের সহায়তায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে গড়ে উঠেছিল ‘সরাইল পাবলিক লাইব্রেরি’ নামের একটি আলোকিত প্রতিষ্ঠান। উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় শিক্ষিত সংস্কৃতিমনা কতিপয় ব্যক্তির শ্রমঘামে এগিয়ে যাচ্ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে ৪৪ বছর আলো ছড়িয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে এখন কফিনে। সম্পূর্ণ অরক্ষিত লাইব্রেরিটি এখন মাদকসেবীদের রাতের আড্ডাখানা। গায়েব হয়ে গেছে লাইব্রেরির ২ হাজার ৫ শতাধিক বই ও অফিসিয়াল সকল রেকর্ডপত্র। উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা, অব্যস্থাপনা ও পরিচালনা কমিটি না থাকাই লাইব্রেরিটির চরম দুর্দশার জন্য দায়ী বলে মনে করেন স্থানীয়রা। সরজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, ১৯৮০ সালের ২রা জুন সরাইল পাবলিক লাইব্রেরির দ্বিতল ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. ফরিদুল হুদা। পদাধিকারে এটির পরিচালনা কমিটির সভাপতি থাকেন থানা/ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

তিনিই স্থানীয় সাহিত্য সংস্কৃতিমনা, দায়িত্বশীল ও কর্মঠ একজন ব্যক্তিকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করেন। তিনিই এটির রক্ষণাবেক্ষণসহ সকল প্রকারের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ছিলেন একজন কেয়ারটেকারও। এই প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সুন্দর সুশৃঙ্খলভাবে চলছিল লাইব্রেরিটি। এক সময় বইয়ের সংখ্যা আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যায়। দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে পাঠকের কলেবর। অবসর সময়ে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রভাষক ও শিক্ষার্থীদের পদচারণায় সমৃদ্ধ ছিল লাইব্রেরিটি। জাতীয় দিবসে কবিতা আবৃত্তি, প্রবন্ধ পাঠ, রচনা লেখা, চিত্রাঙ্কন, বিতর্ক ও গানের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো এখানে। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সভা সেমিনারের প্রাণকেন্দ্র ছিল এটি। পরে ২০১৩ সালের শেষে দিকে কমিটি গঠনে ইউএনও মোহাম্মদ এমরান হোসেন সভাপতি ও ঠাকুর মেজবাহ উদ্দিন মিজানকে সাধারণ সম্পাদক হন। ওই কমিটির দায়িত্বশীল কর্মজজ্ঞে তখনও জ্বলজ্বল করে জ্বলছিল এই লাইব্রেরির প্রদীপ। কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ওই সালেই সরে দাঁড়ান মিজান। আর তখন থেকেই লাইব্রেরিটির লাল সূর্যটি অস্তমিত হতে থাকে।

ইউএনও পদে যোগদান করেন সৈয়দা নাহিদা হাবিবা। কমিটি গঠনের জন্য নিয়মিত প্রস্তাব ও চেষ্টা করতে থাকেন স্থানীয়রা। ২০১৪ থেকে ২০২৬ সাল। ১৪ বছরে বিদায় নিলেন ১৪ জন ইউএনও। তাদের কেউই সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটির কমিটি গঠন করলেন না। মাঝে মারা গেলেন কেয়ারটেকারও। ইউএনওদের গা ছাড়া ভাবের কারণে কোনো ধরনের তদারকি না থাকায় বেহাল হতে থাকে এটি। এক সময় লাইব্রেরির নিচতলায় থাকা ইসলামিক ফাউন্ডেশনও চলে যায় অন্যত্র। পুরো দ্বিতল ভবনটি নিস্তব্ধ হয়ে যায়। নিরাপত্তা দেয়াল, ভবনের নিচতলার প্রধান ফটক ও দ্বিতীয় তলায় লাইব্রেরিতে যাওয়ার গেট ২৪ ঘণ্টায় অজানা কারণে থাকে খোলা। সুযোগ লুফে নেয় মাদকসেবী ও চোরের দল। উপজেলা প্রশাসন পাড়ার এই লাইব্রেরিতে রক্ষিত আড়াই সহস্রাধিক বই গত ৭-৮ মাসে গায়েব হয়ে যায়। প্রয়োজনীয় রেজিস্ট্রার নথি, কাগজপত্র, চেয়ার-টেবিল সব নিয়ে গেছে। সর্বশেষ একাধিক জানালার গ্রিল খুলে নিয়ে গেছে। এত লম্বা সময় ধরে লাইব্রেরির বই ও অন্যান্য সরঞ্জাম চুরি হলেও উপজেলা প্রশাসনের কোনো মাথা ব্যথা নেই। এখন লাইব্রেরিতে প্রবেশ করলে মনে হয় দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত কোনো ভবন এটি। এক সময়ের জীবন্ত লাইব্রেরিটি এখন কফিনে মৃত লাশ। এটির ভেতরের বর্তমান চিত্র দেখলে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না কোনো বই প্রেমিক। লাইব্রেরিটিকে পুনর্জীবিত ও রক্ষা করা সরাইলবাসীর প্রাণের দাবি।

মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ বদর উদ্দিন, স্থানীয় ত্রিতাল সংগীত নিকেতনের অধ্যক্ষ লেখক, গবেষক ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সঞ্জীব কুমার দেবনাথ, পাবলিক লাইব্রেরির সাবেক সম্পাদক ও সরাইল প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. আইয়ুব খান আক্ষেপ করে বলেন, এটি লাইব্রেরির নিজস্ব ভবন। চোখের সামনে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হতে পারে না। দীর্ঘ সময় কমিটি না থাকা, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও উপজেলা প্রশাসনের দায়িত্বহীনতা এর জন্য দায়ী। সরাইল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মৃধা আহমাদুল কামাল বলেন, বারবার তাগাদা দেয়ার পরও গত ১২-১৪ জন ইউএনও অজানা কারণে কমিটি গঠনে বিন্দু পরিমাণ ভূমিকা নেননি। তাদের এমন অনীহা ও অবহেলার কারণেই আজ লাইব্রেরিটির এই করুণ দশা। এ বিষয়ে সদ্য যোগদানকৃত সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, কাজ শুরু করেছি মাত্র। সবকিছু তো এখনো জানতে পারিনি। আস্তে আস্তে জেনে নেবো। সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতায় লাইব্রেরির বিষয়টি আমি দেখবো।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন