মো. জাকির হোসেন খন্দকার। কেরানীগঞ্জের ব্রাইট লাইফ কিন্ডারগার্টেন অ্যান্ড হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক। প্রথমে স্কুলের সুশ্রী কিশোরী ছাত্রীদের টার্গেট করতেন জাকির। পড়াশোনার খোঁজখবর নেয়ার কথা বলে কৌশলে তাদের সংগ্রহ করতেন মোবাইল নম্বর। এরপর ফোনে আপত্তিকর মেসেজ পাঠাতেন। সুযোগ-বুঝে স্কুলের ফাঁকা রুমে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানির চেষ্টা করতেন। এভাবে চার কিশোরী জাকিরের ফাঁদে পড়ে যৌন হয়রানির শিকার হয়। জাকিরের নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে এক শিক্ষার্থী। এমন অপকর্মের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে গত ১৯শে এপ্রিল জাকিরকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
গত সোমবার চার শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া শ্লীলতাহানির ঘটনা আদালতে তুলে ধরে। এক শিক্ষার্থী জবানবন্দিতে বলে, ২০২৫ সালে ব্রাইট লাইফ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি হয়। ভর্তি হওয়ার তিনদিন পর ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের টার্গেটে পড়ে সে। একদিন কৌশলে তার ফোন নম্বর নেন। এরপর বন্ধুত্বের অফার দেন। ফোনে নানা রকম বাজে মেসেজ পাঠানো শুরু করেন। কয়েকদিন পর বিয়ের প্রস্তাব দেন। একদিন স্কুল ছুটির পর তার রুমে ওই ছাত্রীকে ডাকেন। কথামতো বাধ্য হয়ে ওই শিক্ষকের রুমে প্রবেশ করে। হঠাৎ করেই তাকে জড়িয়ে ধরে। বহু চেষ্টার পরও তাকে ছাড়ে নাই। পরে তাকে এ ঘটনার খবর কাউকে না বলার জন্য ভয় দেখান। বললে স্কুল থেকে টিসি দিয়ে তার জীবন ধ্বংস করে দেয়ারও হুমকি দেন। এই ভয়ে সে প্রথমে কাউকে এ ঘটনা জানায়নি। কিন্তু তিনি প্রায়ই ফোন দিয়ে তাকে ডিস্টার্ব করা অব্যাহত রাখেন। তার সঙ্গে সময় দিতে বলতেন। ফের একদিন তিনি তাকে স্কুলে ডেকে নেন। এবার জোর করে তার জামা কাপড় খুলে ফেলেন। শুধু তাই নয়, এই অবস্থায় তার ভিডিও করা হয়। এবারও আগের মতো কাউকে বললে ভিডিও ভাইরাল করে দেয়ার হুমকি দেয়। কয়েকদিন পর ভিডিও ভাইরাল করে দেয়ার কথা বলে ধর্ষণের চেষ্টা করে তাকে। ওই শিক্ষার্থী বলে, এই শিক্ষক শুধু তার সঙ্গে নয়, আরও অনেক ছাত্রীর সঙ্গে এমন কাজ করেছেন। শুধু তাই নয়, ওই শিক্ষার্থীর ছোট বোনের সঙ্গেও এমনটি করেছেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে সে।
আরও দু’জন শিক্ষার্থীর জবানবন্দিতেও এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে। জবানবন্দিতে তারা বলে, ২০২৫ সালে তারা ব্রাইট লাইফ কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি হয়। একইভাবে তাদের ফোন নম্বর সংগ্রহ করেন। একদিন তাদের একজনকে রুমে বন্ধুত্বের প্রস্তাব দেন। হঠাৎ লাইট বন্ধ করে দেন। তার মুখ চেপে ধরে। বহু কষ্টে সে যাত্রায় পালিয়ে রেহাই পায় ওই শিক্ষার্থী। অপর আরেক শিক্ষার্থী জানায়, স্কুল শেষে কোচিং করতো। একদিন ওই শিক্ষক তাকে সকালে কোচিংয়ে আসতে বলেন। কোচিং-এ গিয়ে দেখেন দু’জন শিক্ষার্থী ছাড়া আর কেউ নেই। তারা বুঝতে পারেÑ স্যারের মতলব ভালো না। পরে তারা কৌশলে চলে যায়।
আদালত সূত্র জানায়, অভিযুক্ত মো. জাকির হোসেন খন্দকার ঢাকার কেরানীগঞ্জ উপজেলার চুনকুটিয়া ঝাউবাড়ী এলাকার ব্রাইট লাইফ কিন্ডারগার্টেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
বাদীর আইনজীবী জাকির হোসেন বলেন, অভিযুক্ত শিক্ষক যে ঘটনা ঘটিয়েছেন তা ন্যক্কারজনক। তিনি আরও কোনো ছাত্রীর সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটিয়েছেন কিনা তা রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রীদের বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। তার কারণে এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে বলেও জানায় এলাকাবাসী। শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে তিনি একা পেলেই তাদের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ করতেন এবং কু-প্রস্তাব দিতেন। ঘটনার দিন সকালে এক ছাত্রীকে কক্ষে ডেকে নিয়ে জোরপূর্বক জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করলে সে চিৎকার করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে। পরে বিষয়টি প্রকাশ পেলে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী একই ধরনের অভিযোগ তোলে। এ ঘটনায় এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বাবা বাদী হয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেন। অভিযোগে বলা হয়, তার মেয়েসহ একাধিক শিক্ষার্থীকে ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন সময়ে অসদাচরণ করা হয়েছে।
