পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভয় দেখাতে যৌন সহিংসতা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ভয় দেখাতে যৌন সহিংসতা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে

ফন্ট সাইজ:

যৌন হামলার কারণে ২৯ বছর বয়সী কুসাই আবু আল-কাবাশ এখনো শারীরিক ও মানসিকভাবে ভুগছেন। অভিযোগ অনুযায়ী একদল ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী তার ওপর এই নির্যাতন চালায়। ঘটনা ঘটে জর্ডান উপত্যকায় অবস্থিত অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি বেদুইন সম্প্রদায়ে। সেখানে তিনি বসবাস করেন। ১৩ মার্চ গভীর রাতে ৭০ জনেরও বেশি বসতি স্থাপনকারী খিরবেত হামসা আল-ফাওকা এলাকায় হামলা চালায়।

কুসাই আল জাজিরাকে জানান, হামলাকারীরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে ফিলিস্তিনি তাঁবুগুলোতে আক্রমণ করে। পাঁচজন হামলাকারী তার তাঁবুতে ঢোকে। সেখানে তিনি তখন ঘুমাচ্ছিলেন। তাকে হাত ও লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে মারধর শুরু করে। একই তাঁবুতে থাকা দুই বিদেশি নারী কর্মীকেও তারা নির্যাতন করে। কুসাই বলেন, তারপর তারা আমার হাত-পা বেঁধে জোর করে আমার প্যান্ট খুলে নেয়, বেল্ট দিয়ে শরীর বেঁধে ফেলে এবং আমার অন্তর্বাসও খুলে নেয়। তিনি জানান, এরপর হামলাকারীরা তার গোপনাঙ্গে আঘাত করে। প্লাস্টিকের টাই দিয়ে হাত-পা ও যৌনাঙ্গ বেঁধে ফেলে এবং অপমান করে। পরে তারা হুমকি দেয়, এলাকা না ছাড়লে আবার একই হামলা চালানো হবে।

এই নির্যাতন প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে চলে। এ সময় শিশুদেরসহ বহু বাসিন্দাকে মারধর করা হয় এবং সঙ্গে সঙ্গে এলাকা না ছাড়লে হত্যা করার হুমকি দেয় তারা। হামলাকারীরা শত শত গবাদিপশুও লুট করে। হামলার শেষে কুসাইকে অন্তর্বাস ছাড়াই মাটিতে টেনে নিয়ে যায়। তার পুরো শরীরে, এমনকি চোখেও মারধর করা হয়, যা পরে ফুলে যায়। কুসাই বলেন, এই যৌন হামলার মানসিক প্রভাব শারীরিক আঘাতের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। এরপর আমি খুব রাগান্বিত ও খিটখিটে হয়ে যাই। একা থাকতে চাইতাম, ভীষণ কষ্টে ছিলাম।

ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য
অধিকৃত পশ্চিম তীরে যৌন সহিংসতা ও পরিকল্পিত হয়রানি দিন দিন বেড়েই চলেছে, যা ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা ঘটাচ্ছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, এগুলো আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ফিলিস্তিনিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে তাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করার একটি পদ্ধতিগত হাতিয়ার। ২০ এপ্রিল ‘ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়াম’- যা ‘নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল’-এর নেতৃত্বে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি ইউরোপীয় রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত তারা ‘সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যান্ড ফোর্সিবল ট্রান্সফার ইন দ্য ওয়েস্ট ব্যাংক’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রায় তিন বছর ধরে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সংঘাত-সংশ্লিষ্ট যৌন সহিংসতার ঘটনাগুলো এতে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে জোরপূর্বক নগ্ন করা, শরীর তল্লাশি, ধর্ষণের হুমকি এবং যৌন হয়রানির মতো ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়। এতে বলা হয়, সাক্ষাৎকার দেয়া বাস্তুচ্যুত পরিবারের ৭০ শতাংশের বেশি জানিয়েছেন, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে হুমকি, বিশেষ করে যৌন সহিংসতা, তাদের ঘর ছাড়ার প্রধান কারণ ছিল। তবে ভয়, সামাজিক লজ্জা এবং প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতার কারণে প্রকৃত পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পোশাক খুলে তল্লাশি
৬০ বছর বয়সী আবির আল-সাব্বাঘ ১৩ এপ্রিল জেনিন শরণার্থী শিবিরে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া নারীদের একজন। দীর্ঘ এক বছর ইসরাইলি অবরোধের পর তারা নিজেদের বাড়ি দেখতে যান। কিন্তু তিনি জানতেন না যে তাকে পোশাক খুলে তল্লাশি করা হবে। সেনারা নারীদের শিবিরের প্রবেশমুখে একটি দখলকৃত বাড়িতে নিয়ে যায় তাকে। সেখানে নারী সেনারা অপেক্ষা করছিল বিস্তারিত তল্লাশির জন্য। আবির বলেন, আমরা জানতাম না তারা আমাদের তল্লাশি করবে। জানলে আমি যেতামই না। তিনি বলেন, প্রথমে তারা হাত দিয়ে তল্লাশি করে, তারপর আমাকে পোশাক তুলতে বলে। এরপর খুলতে বলে, তারপর সব কাপড় খুলে ফেলতে বলে। আমি দ্বিধা করলে তারা চিৎকার শুরু করে। আমি বলি আমি শিবিরে ঢুকতে চাই না, চলে যেতে চাই। তখন একজন নারী সেনা চিৎকার করে বলে- তুমি ঢুকতে চাও বা না চাও, তল্লাশি হবেই। আবির কাঁদতে শুরু করেন এবং অনুরোধ করেন, কিন্তু সেনারা তার সঙ্গে চিৎকার করতে থাকে। তিনি বলেন, সেই মুহূর্তে আমি খুব কেঁদেছি। মনে হচ্ছিল, এখানে না এলেই ভালো হতো। আমি ভীষণ অপমানিত বোধ করেছি। জেনিন শিবিরে আমরা যা যা সহ্য করেছি, এর মধ্যে এটিই সবচেয়ে খারাপ।

ব্যাপক রূপ নিচ্ছে
এই সহিংসতা ও যৌন হয়রানি ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে নারী ও মেয়েদের ওপর। ‘ওয়েস্ট ব্যাংক প্রোটেকশন কনসোর্টিয়াম’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ফিলিস্তিনি মেয়ে স্কুল ছাড়ছে এবং নারীরা কাজ বন্ধ করে দিচ্ছে শুধু এই ধরনের হয়রানি এড়ানোর জন্য। হেবরনে ‘ইউথ এগেইনস্ট সেটেলমেন্টস’ সংগঠনের সমন্বয়ক ইসা আমরো আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইল যৌন হয়রানিকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে ফিলিস্তিনিদের জীবন কঠিন হয়ে ওঠে। তার মতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগে এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন ছিল। কিন্তু এখন এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে হেবরনের পুরনো শহরে। অনেক পরিবার ঘর ছেড়ে গেছে এবং অনেক নারী চেকপয়েন্ট পার হওয়া এড়িয়ে চলেন অপমানের ভয়ে। আমরো বলেন, ইসরাইল আমাদের রক্ষণশীল সমাজের বিষয়টি বিবেচনায় নেয় না। সেনারা নারীদের কাপড় খুলতে বাধ্য করে, শরীরের সংবেদনশীল স্থানে হাত দেয়ার চেষ্টা করে, যৌন প্রশ্ন করে এবং ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলে। ইব্রাহিমি মসজিদের আশপাশে ইসরাইলি চেকপয়েন্টগুলোতে নারী ও কিশোরদের নিয়মিত হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ইসরাইলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বি’তসেলেম’ একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে হেবরনের বাসিন্দাদের ওপর সেনাদের অপমান, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের বহু সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়।

কারাগারে ধর্ষণের অভিযোগ
ইসরাইলি কারাগারেও ফিলিস্তিনিদের ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’-এর একটি প্রতিবেদনে বন্দিদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে নির্যাতন ও যৌন সহিংসতার ঘটনা তুলে ধরা হয়। সবচেয়ে আলোচিত একটি ঘটনা হলো গাজা থেকে আটক এক ফিলিস্তিনির ওপর ‘সদে তেইমান’ কারাগারে যৌন নির্যাতন। ভিডিও প্রকাশের পর পাঁচজন সেনার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও, ইসরাইলের ডানপন্থিদের প্রচারণার পর মার্চে তা প্রত্যাহার করা হয়। উত্তর পশ্চিম তীরের তুলকারেমের সাংবাদিক সামি আল-সাই জানান, আটক অবস্থায় তাকে ধাতব বস্তু দিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ‘মেগিদ্দো’ ও ‘রিমন’ কারাগারে তিনি বন্দি ছিলেন এবং প্রায় পুরো সময়ই মারধরের শিকার হন। তিনি বলেন, নির্যাতনের এক পর্যায়ে তারা আমাকে অন্য জায়গায় নিয়ে গিয়ে মাটিতে বসতে বাধ্য করে। তারপর কাপড় খুলে জোর করে আমার শরীরে কঠিন বস্তু প্রবেশ করায়। আমি প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করি। কিন্তু তারা আবার মারধর করে।

এরপর তার রক্তপাত শুরু হলেও চিকিৎসা দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, আমাকে ডাক্তার দেখাতে দেয়নি, এমনকি ক্লিনিকেও যেতে দেয়নি। আমি দুই সপ্তাহ রক্তপাত সহ্য করেছি। এখনো ব্যথা আছে, আর মানসিক ক্ষত তো রয়েছেই।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন