বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এর অস্বাভাবিক বিস্তারে। রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত, যা শিশুদের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, ইনফেকশন ও মস্তিষ্কে প্রদাহ, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। অথচ রোগটি প্রতিরোধযোগ্য, যা টিকা দেয়ার মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। টিকাদান কর্মসূচিতে অনিয়ম, জনসচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে টিকা না নেয়ার প্রবণতা বা নিয়মিত ঠিকাদান কর্মসূচিতে শিথিলতা ও ব্যর্থতা, টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা বা অনীহা এই বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
হামের ইতিহাস: হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যার ইতিহাস অনেক পুরনো। রোগটি খ্রিষ্ট-পূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে বা তার পরে গবাদিপশুর “রিন্ডারপেন্ট” ভাইরাস থেকে বিবর্তিত হয়ে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বলে ধারণা করা হয়। এটি মানুষের মধ্যে আসার পর মিউটেশনের মাধ্যমে পুরোপুরি মানুষের ভাইরাসে পরিণত হয় এবং হাজার বছর ধরে মানুষকে আক্রান্ত করছে।
১৮৪৬ সালে ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জে হামের মহামারির সময় ডেনিশ চিকিৎসক পিটার প্যানাম প্রমাণ করেন, হামের পর দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। ইংল্যান্ডে ১৬৭০ এবং ১৬৭৪ সালে ভয়াবহ হামের মহামারি দেখা দেয়। ১৮৫০-এর দশকে হাওয়াই এবং ১৮৭৫ সালে ফিজিতে হামের মহামারিতে অনেক মানুষ মারা যায়। ১৮শ’-১৯শ’ শতকে ইউরোপ ও আমেরিকায় হাম মহামারি আকারে ছড়ায়। ৯ম শতকে পারস্যের বিখ্যাত চিকিৎসক আল রাযি প্রথম হাম রোগ সম্পর্কে বর্ণনা করেন। তিনি হাম ও গুটিবসন্তের পার্থক্য ব্যাখ্যা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১২ সালে হামকে প্রথম “রিপোর্টেবল ডিজিজ” রোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৫৪ সালে মার্কিন চিকিৎসক জন এন্ডারস ও টমাস পিবলস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের বস্টন নগরীতে হামে আক্রান্ত রোগীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে সেখান থেকে হামের ভাইরাসটিকে পৃথক করতে সক্ষম হন। এরপর হাম প্রতিরোধে টিকা তৈরির কাজ শুরু হয়।
টিকা আবিষ্কার: ১৯৬৩ সালে থমাস পিবলস এবং জন এন্ডারস হামের প্রথম টিকা আবিষ্কার করেন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় দ্রুত বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। পরে উন্নত সংস্করণ তৈরি এবং বিশ্বব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। টিকা দেয়ার ফলে বিশ্ব জুড়ে হামের প্রকোপ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। তবে এখনো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এটি একটি প্রধান স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে।
হামের কারণ: হাম মূলত “মিজলস” নামের এক অতিসংক্রামক ভাইরাস দ্বারা বায়ুবাহিত সংক্রমিত রোগ, যা মানুষের শ্বাসনালীর মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে। আক্রান্ত ব্যক্তি কাশি বা হাঁচি দিলে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি ড্রপলেটের মাধ্যমে অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি বা সংস্পর্শে থাকা এমনকি রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকেও ছড়াতে পারে। ভাইরাসটি মারাত্মক সংক্রামক, একজন আক্রান্ত রোগী ১৫ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে তা ছড়াতে পারে।
ঝুঁকিতে কারা: ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের হাম বেশি হয়, বিশেষ করে টিকা না পাওয়া ৩ থেকে ১০ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যেও হামের প্রবণতা বেশি দেখা যাচ্ছে। যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভোগে, মায়ের দুধ পায়নি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম সম্পন্ন এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি এবং প্রাণঘাতীও। শরীরে ভিটামিন “এ”র অভাব হামের তীব্রতা বাড়িয়ে দেয়, এমনকি অন্ধত্ব বা নিউমোনিয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।
হামের লক্ষণ: সংক্রমণের ৭ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রথমে উচ্চ জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, শুষ্ক কাশি, চোখ লাল ও পানি পড়া এবং মুখের ভেতর সাদা দাগ দেখা দেয়, যাকে বলে কপলিক স্পট। ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে সারা শরীরে লাল ঘামাচির মতো ফুসকুড়ি বা র্যাশ দেখা দেয়। হাম চলে যাবার পরে র্যাশগুলো আর থাকে না, হালকা চামড়া উঠে কিছুটা কালচে হয়ে যায়, পরে সম্পূর্ণ নিরাময় হয়। ফুসকুড়ি ওঠার ৪ দিন আগে থেকে এবং আরও ৪ দিন পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। কোনো জটিলতা না হলে রোগ সারতে ১০ থেকে ১৪ দিন লাগতে পারে।
হামের জটিলতা: হাম ভাইরাসজনিত রোগ হলেও অনেক ক্ষেত্রে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন শিশুদের। এ ছাড়াও হামে আক্রান্ত রোগীর দুর্বলতা অনেক বেশি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়।
(১) নিউমোনিয়া: হামের সবচেয়ে মারাত্মক জটিলতা। রোগীর শ্বাসকষ্ট, কাশি ও বুকে ব্যথা দেখা যায়। নিউমোনিয়া শিশু মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
(২) ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা: ঘন ঘন পাতলা পায়খানা এবং শরীরে পানি ও লবণের ঘাটতি হয়।
(৩) অপুষ্টি ও দুর্বলতা: হাম হলে অপুষ্টি হতে পারে, আবার অপুষ্টি শিশুর হামের জটিলতা অনেক বেশি হয়। অসুস্থ থাকায় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে এবং শিশুর বৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে।
(৪) চোখের সমস্যা: লাল হওয়া, পানি পড়া এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্বও হতে পারে, বিশেষত ভিটামিন “এ”র অভাবে।
(৫) মুখে ঘা এবং কানে ইনফেকশন: কানে ব্যথা, কান পাকা ও পুঁজ হতে পারে। কখনো স্থায়ী শ্রবণশক্তি হ্রাস হতে পারে।
(৬) এনসেফালাইটিস বা মস্তিষ্কের প্রদাহ: এটি বিরল কিন্তু খুবই বিপজ্জনক। খিঁচুনি, অজ্ঞান হওয়া, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে মানসিক বা স্নায়বিক সমস্যা থাকতে পারে।
(৭) সাব-অ্যাকিউট সেক্লরোসিং প্যানএনসেফালাইটিস: বিরল কিন্তু মারাত্মক, কয়েক বছর দেরিতে দেখা দেয়া জটিলতা, যা মস্তিষ্কের গুরুতর ক্ষতি করে।
শনাক্তকরণের পরীক্ষা: রোগীর লক্ষণ দেখেই রোগ শনাক্ত করা যায়, খুব বেশি পরীক্ষার প্রয়োজন নাই। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বা গবেষণার ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত পরীক্ষা করা যেতে পারে যেমন :
(১) রক্তে আই.জি.এম অ্যান্টিবডি।
(২) আরটি-পিসিআর: গলা বা নাকের সোয়াব, অথবা কখনো কখনো প্রস্রাব থেকে হামের ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।
টিকা নিলেও কি হাম হতে পারে: অনেক সময় টিকা নেয়ার পর শরীরে আশানুরূপ হাম প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি না হলে সে পুনরায় হামে আক্রান্ত হতে পারে।
চিকিৎসা ও করণীয়: নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়। বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি ও তরল জাতীয় খাদ্য এবং জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল, পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার দিতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরপর দুইদিন দু’টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ভিটামিন এ ক্যাপসুল বয়স অনুযায়ী সঠিক ডোজে খাওয়াতে হবে।
(২) শিশুর শরীরে র্যাশ দেখা দেয়ার দিন থেকে অন্তত পাঁচদিন অন্যদের কাছ থেকে আলাদা রাখতে হবে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার এবং কাশি-হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখতে হবে।
(৩) জ্বর বেশি হলে বা জটিলতা যেমন শ্বাসকষ্ট, বমি, পাতলা পায়খানা, খিঁচুনি, নিস্তেজ হয়ে পড়া এবং খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হলে হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে।
(৪) নিউমোনিয়া বা অন্যকোনো জটিলতা দেখা দিলে প্রয়োজনে আই.সি.ইউতে ভর্তি করাতে হবে।
(৫) কোনো শিশুর জ্বর এবং শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তা হাম হোক বা না হোক, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
প্রতিরোধের উপায়: হামকে সাধারণ রোগ মনে করা হলেও অবহেলার কারণে এটি প্রাণঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। রোগটি শিশুর শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে দেয়, ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহে জটিলতা তৈরি করে, যা অনেক সময় জীবন কেড়ে নেয়। হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ, যা সবচেয়ে নিরাপদ। বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচিতে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের দুইবার “এম.আর” টিকা দেয়া হয়। প্রথমটি ৯ মাস বয়সে আর দ্বিতীয়টি ১৫ মাস বয়সে। সময় মতো ২ ডোজ টিকা নিলে ৯৭% পর্যন্ত সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
হাম থেকে রক্ষার জন্য শতভাগ শিশুর হামের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং যেসব শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে তাদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় আনতে হবে। মা-বাবা এবং অভিভাবকসহ জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বাচ্চার পুষ্টি উন্নয়ন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা খুবই জরুরি। গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, এমনকি মসজিদের ইমামসহ অন্যান্য ধর্মের ধর্মগুরু এবং স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে কাজকর্ম চালাতে হবে।
হাম প্রতিরোধ জরুরি
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
২১ এপ্রিল (মঙ্গলবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
