ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে দায়িত্বশীল বিরোধী দল হিসেবে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার দিবাগত রাত ১টা ৪৪ মিনিটের দিকে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি এ ঘোষণা দেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের আন্দোলন কখনোই কেবল একটি নির্বাচনের জন্য ছিল না। এটি ছিল গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করা, নাগরিকদের অধিকার রক্ষা করা এবং একটি ন্যায়বিচারপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্য। আমরা নীতিবান, দায়িত্বশীল এবং শান্তিপূর্ণ বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবো; একইসঙ্গে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করে জাতীয় অগ্রগতিতে গঠনমূলক অবদান রাখবো।
জামায়াত আমীর বলেন, শুরু থেকে আমরা একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম। সেই প্রতিশ্রুতিতে এখনো অটল। আমরা সামগ্রিক ফলাফলকে স্বীকৃতি দিচ্ছি এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, বিগত মাসগুলোতে যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, সেই অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকদের প্রতি আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আপনাদের মধ্যে অনেকে নিজের সময়, শক্তি ও বিশ্বাস উৎসর্গ করেছেন। অনেকে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আপনাদের এই সাহসিকতা আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে।
নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে ডা. শফিকুর রহমান লেখেন- আমি জানি, আপনারা অনেকে আজ ব্যথিত এবং গভীরভাবে হতাশ। এটা স্বাভাবিক। যখন আপনি কোনো আদর্শের পেছনে নিজের হৃদয় ঢেলে দেন, তখন তার ফলাফল আপনাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই আপনাদের প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। ৭৭টি আসন নিয়ে আমরা সংসদে আমাদের উপস্থিতিকে প্রায় চারগুণ বৃদ্ধি করেছি এবং আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম শক্তিশালী বিরোধী ব্লকে পরিণত হয়েছি।
ইতিহাস স্মরণ করিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, রাজনীতির ভাগ্য পরিবর্তন হয়। ২০০৮ সালে বিএনপি মাত্র ৩০টি আসনে নেমে এসেছিল, যেখান থেকে দীর্ঘ ১৮ বছরের পথ পাড়ি দিয়ে ২০২৬ সালে তারা সরকার গঠন করেছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতি একটি দীর্ঘ পথ। আমাদের পথ এখন পরিষ্কার মানুষের আস্থা অর্জন করা, ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দায়িত্বশীলভাবে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়া।
এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে ডা. শফিকুর রহমান দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হবার পর ভোট গণনার সময় অনিয়ম করা হয়েছে। ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়েছে। এই পচা রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান চেয়েছিলাম, কিন্তু তা হয়নি। এর থেকে আমরা প্রতিকার চাই। নির্বাচন কমিশনের কাছে এ বিষয়ে স্পষ্ট পদক্ষেপ কামনা করছি। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও অনুযায়ী ঋণখেলাপিদের নির্বাচনে সুযোগ দেয়ার সুযোগ না থাকলেও তাদের ভোট করতে দেয়া হয়েছে। যা আইনের লঙ্ঘন। তিনি আরও বলেন, নির্বাচন শেষে ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে অনিয়ম হয়েছে। দেশবাসী আমাদের ওপর আস্থা রাখুক, আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকবো, অধিকার আদায় করেই ছাড়বো। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা বাংলাদেশে সুস্থ ধারার রাজনীতির পক্ষে। আমরা চাই পুরনো ধারার রাজনীতি না হোক। আমরা দেশকে ভালোবাসি, ইতিবাচক ধারার রাজনীতি চাই। নির্বাচন মানে হার-জিত থাকবে, সেটা যদি স্বাভাবিকভাবে হয়ে থাকে তাহলে সবাই মেনে নেয়। যদি বৈষম্য হয়ে থাকে তাহলে প্রশ্নের জন্ম দেয়। আমরা আশা করবো জাতির সেন্টিমেন্টের ওপর সম্মান রেখে নির্বাচনে কালোটাকা, অনিয়ম, পেশিশক্তি যাই হয়েছে, হয়েছে। এটার প্রতিকার করতে আমাদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলতে দিবেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, সারা দেশে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা শুরু হয়েছে। এগুলো বন্ধ করতে হবে, তা না হলে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে আমরা বাধ্য হবো। ভদ্রতা আমাদের দুর্বলতা নয়, আমরা এসব ঘটনার প্রতিকার চাই। বেশ কিছু জায়গায় ফলাফল হঠাৎ বন্ধ করা হয়েছে, রেজাল্ট শিটে পরিবর্তন করা হয়েছে। ঢাকা-৮ আসনে কেন্দ্র দখল করে যা হয়েছে তা সবাই দেখেছে। যে কারণে নাসীরুদ্দীনের আসনে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে ঠিক একই কারণে মামুনুল হকের আসনে ভোট বাদ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন।
তিনি বলেন, দেশবাসী যারা আমাদেরকে ভোট দিয়েছে, আজকে থেকে আরও শক্তভাবে আমরা আপনাদের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষ একই সংবিধানের অধীনে সবাই সমান অধিকার পাবো। ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসলে আমরা লড়ে যাবো, এখানে কোনো ছাড় দিবো না। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
