ইরান যুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যেও চীনের অর্থনীতি ‘গতিশীল’

ইরান যুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যেও চীনের অর্থনীতি ‘গতিশীল’

ফন্ট সাইজ:

ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল পণ্যের শক্তিশালী রপ্তানি বছরের প্রথম তিন মাসে চীনের অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করেছে। ইরান যুদ্ধ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি সত্ত্বেও বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, সামনে ‘অস্থির’ বৈদেশিক পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক চাহিদা দুর্বল করছে, যা চীনের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন সিএনএন।

বৃহস্পতিবার চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (এনবিএস) জানায়, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ ভাগ বেড়েছে। এটি আগের বছরের শেষ প্রান্তিকের ৪.৫ ভাগ প্রবৃদ্ধির তুলনায় বেশি। এনবিএস এই সূচনাকে দৃঢ়ভাবে শুরু হিসেবে বর্ণনা করলেও অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে সতর্ক করেছে। সংস্থাটির উপকমিশনার মাও শেংইয়ং বলেন, বৈদেশিক পরিস্থিতি আরও জটিল ও অস্থির হয়ে উঠেছে। আর দেশে শক্তিশালী সরবরাহ ও দুর্বল চাহিদার মতো কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা এখনও স্পষ্ট।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর চীন প্রথম বড় অর্থনীতি হিসেবে প্রথম প্রান্তিকের জিডিপি তথ্য প্রকাশ করল। ফলে এই পরিসংখ্যান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রভাবের একটি প্রাথমিক চিত্র তুলে ধরছে। জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় কাঁচামালের খরচ বেড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হয়েছে। এতে চীনা ভোক্তারা আরও চাপে পড়তে পারেন। কারণ ২০২১ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী রিয়েল এস্টেট সংকটের কারণে তারা আগেই কম খরচ করছেন।

চীন তার উৎপাদন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে রপ্তানি বাড়িয়েছে, যা গত বছর দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্তকে রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যায়। তবে এই রপ্তানিনির্ভরতা এখন বড় ঝুঁকি হিসেবেও দেখা দিচ্ছে। বছরের প্রথম দুই মাসে রপ্তানি ২১.৮ ভাগ বাড়লেও মার্চে তা হঠাৎ ২.৫ ভাগে নেমে আসে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে শুরু হওয়া যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং পরিবহন খরচ বাড়ার প্রভাব এতে পড়েছে। ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের চীনবিষয়ক অর্থনীতিবিদ জিচুন হুয়াং বলেন, চীনের অর্থনীতি এখনো স্থিতিশীল থাকলেও এটি ক্রমেই বৈদেশিক চাহিদার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে। ইরান যুদ্ধ এই প্রবণতাকে আরও বাড়াতে পারে।

তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মার্চের পতন আংশিকভাবে চীনা নববর্ষের মৌসুমি প্রভাবের কারণে হয়েছে। পুরো প্রান্তিকে রপ্তানি এখনও ১৪.৭ ভাগ বেড়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের ৫.৫ ভাগ থেকে বেশি। চীনের শক্তি হলো উচ্চমূল্য ও উচ্চপ্রযুক্তির পণ্যে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সবুজ প্রযুক্তিতে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এই খাতগুলোর চাহিদা আরও বাড়াতে পারে। প্রথম প্রান্তিকে বৈদ্যুতিক যান, লিথিয়াম ব্যাটারি এবং উইন্ড টারবাইন পণ্যের রপ্তানি যথাক্রমে ৭৮ ভাগ, ৫০ ভাগ এবং ৪৫ ভাগ বেড়েছে।

রপ্তানি ও শিল্প উৎপাদন শক্তিশালী হলেও ভোগব্যয় অর্থনীতির দুর্বল দিক হিসেবে রয়ে গেছে। শিল্প উৎপাদন ৫.৭ ভাগ বেড়েছে, যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি। কিন্তু খুচরা বিক্রি মার্চে ১.৭ ভাগে নেমে এসেছে, যা আগের দুই মাসে ছিল ২.৮ ভাগ। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্লেষক ইং ঝাং বলেন, সরকারি ভর্তুকির প্রভাব কমে যাওয়ায় এবং গাড়ির চাহিদা কমায় খুচরা বিক্রির গতি কমছে। তিনি আরও বলেন, কাঠামোগত সংস্কারের অভাবে ২০২৬ জুড়ে ভোগব্যয় দুর্বলই থাকবে।

তিন বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো চীনের কারখানা পর্যায়ের দাম ইতিবাচক হয়েছে। প্রোডিউসার প্রাইস ইনডেক্স ০.৫ ভাগ বেড়েছে। এটি একদিকে ডিফ্লেশন থেকে বের হওয়ার ইঙ্গিত দিলেও, বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন- এটি চাহিদা-চালিত নয়, বরং খরচ-চালিত মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ, কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।

ট্যাগসমূহ:

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন