ইরান প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে পশ্চিমা দুনিয়ার মতো অতোটা উন্নত নয়। তবুও তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের বিরুদ্ধে যেভাবে ফাইট দিয়েছে তা বিস্মিত করেছে বিশ্ববাসীকে। কিন্তু কিভাবে এতটা সফল হলো ইরান! এ নিয়ে যখন নানা কৌতুহল তখন ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান নজরদারির জন্য গত বছর গোপনে কেনা একটি চীনা নির্মিত স্যাটেলাইট ব্যবহার করেছে ইরান। স্যাটেলাইটটির নাম টিইই-০১বি। চীনা প্রতিষ্ঠান আর্থ আই কোম্পানি এটা তৈরি ও উৎক্ষেপণ করেছে। পরে এটি ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) এরোস্পেস ফোর্সের হাতে হস্তান্তর করা হয়। আই আর্থ কোম্পানি একটি তুলনামূলকভাবে অপ্রচলিত ‘ইন-অরবিট ডেলিভারি’ মডেলের আওতায় কাজ করে। এই ব্যবস্থায় চীনে উৎক্ষেপণের পর কক্ষপথে পৌঁছানোর পরই স্যাটেলাইট বিদেশি ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানি কমান্ডাররা স্যাটেলাইটটিকে ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর নজরদারির দায়িত্ব দেয়। এই চুক্তির অংশ হিসেবে আইআরজিসি বেইজিংভিত্তিক স্যাটেলাইট সেবা প্রদানকারী এম্পোস্যাট পরিচালিত একটি বাণিজ্যিক গ্রাউন্ড স্টেশন নেটওয়ার্কেও প্রবেশাধিকার পায়। যার কার্যক্রম এশিয়া, লাতিন আমেরিকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্যাটেলাইটটি ১৩, ১৪ ও ১৫ মার্চ সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসের ছবি ধারণ করে। ১৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প স্বীকার করেন যে সেখানে অবস্থানরত মার্কিন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়াও, স্যাটেলাইটটি জর্ডানের মুওয়াফফাক বিমানঘাঁটি, বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তরের আশপাশের এলাকা এবং ইরাকের ইরবিল বিমানবন্দরের কার্যক্রমও নজরদারি করে।
স্যাটেলাইটটির নজরদারির আওতা আরও বিস্তৃত ছিল। এতে কুয়েতের ক্যাম্প বুয়েহরিং ও আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি, জিবুতির ক্যাম্প লিমোনিয়ের, ওমানের ডুকম ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এছাড়াও, উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক অবকাঠামোও নজরদারিতে ছিল। যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান কন্টেইনার পোর্ট ও কিদফা পাওয়ার অ্যান্ড ডিস্যালাইনেশন কমপ্লেক্স এবং বাহরাইনের আলবা অ্যালুমিনিয়াম প্ল্যান্ট, যা বিশ্বের বৃহত্তম অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর একটি।
একজন সাবেক পশ্চিমা জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, চীনের কোনো কোম্পানি সরকারের অনুমোদন ছাড়া এমনভাবে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পারে- এটা বিশ্বাস করা কঠিন। অনেকদিন ধরেই পরিষ্কার যে চীন ইরানকে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে। তবে সরকার সরাসরি জড়িত এটা আড়াল করার চেষ্টা করছে।
আইআরজিসির মাধ্যমে চীনা উৎসের স্যাটেলাইট ব্যবহারের এই ঘটনা, বিশেষ করে এমন এক সংঘাতের সময় যখন ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়াতে পারে। এই উদ্বেগ আরও বাড়ে কারণ চীনের সঙ্গে এই অঞ্চলের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। চীন এখানকার প্রধান বাণিজ্য অংশীদার এবং তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। পৃথকভাবে আগের কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসলাইল যৌথ বোমা হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসলাইলের লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কিত রুশ স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্যও পেয়েছিল। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বারবার অস্বীকার করেছে যে তারা ইরানকে কোনো ধরনের সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের মতে, চীন দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে সমর্থন দিয়ে আসছে এবং ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহারযোগ্য দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য শিল্প উপাদান সরবরাহ করেছে।
