নির্বাচন কমিশনের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন

প্রথম দফার ভোটে নিরাপত্তায় থাকছে দুই লাখ জওয়ান ও পুলিশ

ফন্ট সাইজ:

২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গে প্রথম দফার বিধানসভা ভোট। এই ভোটে কত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হবে, কোন জেলায় কত বাহিনী থাকবে— তার হিসাব দিল নির্বাচন কমিশন। প্রথম দফার ভোটে মোট ২,৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে চলেছে তারা।
কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, প্রথম দফায় সমগ্র উত্তরবঙ্গের জেলাগুলির ভোটগ্রহণ হয়ে যাবে। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর এবং দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদহ। পাশাপাশি জঙ্গলমহলেও প্রথম দফায় নির্বাচন রয়েছে। ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার পাশাপাশি বীরভূম, মুর্শিদাবাদে এই দফাতেই ভোট হবে। অন্য দিকে, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পশ্চিম বর্ধমানেও এই দফায় ভোটগ্রহণ হবে।

কমিশন যে হিসাব দিয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রথম দফার ভোটে সবচেয়ে বেশি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হচ্ছে মুর্শিদাবাদ জেলায়। তবে মুর্শিদাবাদ জেলাকে দুই ভাগে ভাগ করেছে কমিশন। এক, মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলা। দুই, জঙ্গিপুর পুলিশ জেলা। দুই মিলিয়ে মুর্শিদাবাদে মোট কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হচ্ছে ৩১৬ কোম্পানি। তার মধ্যে মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলাতেই থাকবে ২৪০ কোম্পানি বাহিনী। বাকি ৭৬ কোম্পানি মোতায়েন হবে জঙ্গিপুরে।

মুর্শিদাবাদের পরেই রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর। কমিশন জানিয়েছে, শুভেন্দু অধিকারীর জেলায় ২৭৩ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। এই দফাতেই নন্দীগ্রামে ভোট রয়েছে। সেই কেন্দ্রে এবারও বিজেপির প্রার্থী বিদায়ী বিধায়ক তথা পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু। তার বিপক্ষে তৃণমূল প্রার্থী করছে পবিত্র করকে। তৃণমূলের প্রার্থিতালিকা ঘোষণার দিনই তিনি বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের হিসাবে শুভেন্দুর জেলার পরেই রয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুর। ওই জেলায় ২৭১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করছে কমিশন।

বাঁকুড়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হবে ১৯৩ কোম্পানি। তার পরেই বীরভূম। ওই জেলায় ১৭৬ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কমিশন। এ ছাড়াও, মালদহে ১৭২ কোম্পানি, পুরুলিয়ায় ১৫১ কোম্পানি, কোচবিহারে ১৪৬ কোম্পানি, দক্ষিণ দিনাজপুরে ৮৩ কোম্পানি, ঝাড়গ্রামে ৭৪ কোম্পানি, দার্জিলিঙে ৬১ কোম্পানি, কালিম্পঙে ২১ কোম্পানি, জলপাইগুড়িতে ৯২ কোম্পানি, আলিপুরদুয়ারে ৭৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হচ্ছে।

রাজ্যের বেশ কয়েক জন আমলা এবং পুলিশ কর্মকর্তাকে তাদের পদ থেকে অপসারণ করে নির্বাচন কমিশন। বুধবার রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত ছিল। সেই সব পদে নতুন কর্মকর্তাও নিয়োগ করে দেয়া হয়। শুধু তা-ই নয়, কমিশন স্পষ্ট জানায়, যাদের অপসারণ করা হচ্ছে, তাদের এ রাজ্যে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে আপাতত আর নিয়োগ করা যাবে না।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের ক্ষেত্রে কমিশনের এই ‘সক্রিয়তা’ নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে শাসকদল তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এভাবে অপসারণের পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে চিঠিও লেখেন। চিঠিতে তিনি অভিযোগ করেন, রাজ্য সরকারের সঙ্গে আগাম কোনও আলোচনা না-করে বা কোনও মতামত না-নিয়ে বদলি করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, অতীতে নির্বাচন চলাকালীন কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাকে সরানোর প্রয়োজন হলে কমিশনের পক্ষ থেকে সাধারণত রাজ্য সরকারের কাছে তিন জনের একটি প্যানেল চাওয়া হত। সেই তালিকা থেকে কমিশন নিজেই এক জনকে বেছে নিত। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এ বার সেই প্রচলিত রীতির সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ঘটেছে। প্রার্থিতালিকা ঘোষণার আগেও কমিশনকে এ বিষয়ে তোপ দাগেন মমতা। নিশানা করেন কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকেও।
রাজ্যে নতুন করে ১৫০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিল নির্বাচন কমিশন। অমিত শাহের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক আরও বাহিনী পাঠাচ্ছে। এর আগে পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের জন্য ২৪০০ কোম্পানি বাহিনী নিযুক্ত ছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়াল ২৫৫০ কোম্পানিতে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, বাহিনীর সংখ্যা এর পরেও আরও কিছুটা বাড়ানো হতে পারে। রাজ্যে সুষ্ঠু, অবাধ এবং শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ বলে দাবি।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে আট দফায় বিধানসভা ভোট হয়েছিল। এবার দফার সংখ্যা দুই করেছে কমিশন। আগামী ২৩ এবং ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোট হবে। ফল ঘোষণা ৪ মে। ভোটের দফা কমানোর সঙ্গে সঙ্গেই দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার জানিয়ে দিয়েছিলেন, অবাধ, শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সব রকম পদক্ষেপ করবেন তারা। নিরাপত্তায় কোনও ফাঁক রাখা হবে না। সেই মতো এ বারের ভোটে পর্যবেক্ষকের সংখ্যাও নজিরবিহীন ভাবে বেশি। প্রত্যেক বিধানসভা কেন্দ্রের জন্য এক জন করে সাধারণ পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে কমিশন। পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব সংক্রান্ত পর্যবেক্ষকের সংখ্যাও আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোটের জন্য প্রথমে ৪৮০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল। গত ১৯ মার্চ বিবৃতি জারি করে অতিরিক্ত আরও ১৯২০ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েনের কথা জানায় কেন্দ্র। ১৭ এপ্রিলের মধ্যে এই বাহিনী মোতায়েতের কথা বলা হয়েছিল। ভোট ঘোষণা হওয়ার আগে থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই সমস্ত জওয়ান রাজ্যে চলে এসেছেন। পাড়ায় পাড়ায় টহলও দিচ্ছেন। চলছে রুটমার্চ। তার মধ্যেই বুধবার আরও ১৫০ কোম্পানি অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েনের কথা জানানো হল। কেন্দ্র জানিয়েছে, ১৮ এপ্রিলের মধ্যে এই বাহিনীকে রাজ্যে এসে কাজ শুরু করে দিতে হবে।
আরও বাহিনী প্রয়োজন বলে শাহের মন্ত্রককে জানিয়েছিল নির্বাচন কমিশন। তাদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে নতুন করে বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কেন্দ্র জানিয়েছে, এই ১৫০ কোম্পানি বাহিনীর মধ্যে সিএপিএফ (কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী) রয়েছে ৯৫ কোম্পানি। এ ছাড়া, মিজ়োরাম, অসম, মেঘালয়, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, মহারাষ্ট্র, ছত্তীসগঢ় এবং ঝাড়খণ্ড থেকে এসএপি (বিশেষ সশস্ত্র পুলিশ) পশ্চিমবঙ্গে নিয়োগ করা হচ্ছে। আগামী দিনে প্রয়োজনে বাহিনীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন