রংপুরের দুটি আসনে চলছে মারামারি, ভাঙচুর, বিক্ষোভ। বিএনপি ও ১১ দলীয় জোট জামায়াত রাজনৈতিক দুটি দলের নেতাকর্মীরা একে-অপরের মুখোমুখি অবস্থানে চলে গেছেন। অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে সতর্ক অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গতকাল রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে রংপুর-৪ আসনের কাউনিয়া উপজেলা। এদিকে এ আসনের হারাগাছেও ভোর থেকে সড়ক অবরোধ করে এলাকাবাসী। আন্দোলনের একপর্যায়ে উপস্থিত হন বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা। তবে তিনি ছিলেন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। খবর পেয়ে হারাগাছে ছুটে আসেন বিএনপি’র রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলু। এ সময় তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভরসা। তখন তিনি বলেন, ‘ভাই আমি ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের শিকার হয়ে গেলাম’। নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে বিএনপি’র প্রার্থীকে পরাজিত করার অভিযোগে রংপুরে দুটি সংসদীয় আসনে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এলাকাবাসী নির্বাচনের ভোট পুনঃগণনা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। একই দাবিতে পীরগঞ্জে উপজেলা পরিষদ ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছে এলাকাবাসী।
জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ (পীরগাছা-কাউনিয়া) আসনে বিএনপি’র প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসাকে হারিয়ে জয়ী হন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপি’র সদস্য সচিব আখতার হোসেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অভিযোগ তোলেন এমদাদুল হক ভরসা। সেইসঙ্গে শুক্রবার সকাল ১১টায় তিনি ডিসির বাংলোস্থ অফিসে ভোট পুনঃগণনার জন্য আবেদন দিতে যান। কিন্তু বেলা ৩টা পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও তিনি যোগাযোগ করতে পারেননি। পরে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজী মো. শাহানের মাধ্যমে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে ভোট পুনঃগণনার জন্য আবেদন করেন এমদাদুল হক ভরসা। এ খবর কাউনিয়া উপজেলার হারাগাছে পৌঁছালে বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে এলাকাবাসী। হাজার হাজার মানুষ হারাগাছে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। এতে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ চলছিল। এদিকে, এমদাদুল হক ভরসা নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি বলেন, গত ১৫ মাস আমি সংসদীয় আসনের প্রায় ৩ লাখ মানুষের সঙ্গে দেখা করে হাত মিলিয়েছি। প্রত্যেক বাড়ি বাড়ি গিয়েছি। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছে। আমার বিশ্বাস ছিল আমি বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো। কিন্তু ভোট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমার রায়কে ছিনতাই করা হয়েছে। রংপুর-৪ আসনের জনগণ এ রায় মানে না। এনসিপি’র সদস্যরা জুলাইযোদ্ধা না, জুলাই বিক্রেতা। তারা জুলাইকে বিক্রি করে খেয়েছে। তারা রায় ছিনতাই করবে, এটি হতে দেবো না।
অপরদিকে বিকালে কাউনিয়ার টেপামধুপুর ইউনিয়নর ভায়েরহাটে নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা সফল হবে না। পীরগাছা-কাউনিয়ার জনগণ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটি কেউ পাল্টাতে পারবে না। সহজভাবে বলতে চাই আমরা শান্তির রাজনীতি করতে চাই। গতকাল জয়ী হওয়ার পর এনসিপি কিংবা জামায়াতের কোনো নেতাকর্মী কারও ওপর ন্যূনতম আঁচড় দেয়নি। আজকে হারাগাছে আমার নেতাকর্মীদের লাঠি দিয়ে হামলা করা হয়েছে। এতে ৪ জন আহত হয়েছে। আমাদের নেতাকর্মীদের বাড়িতে তারা হামলা চালিয়েছে। বলতে চাই, শাপলা কলি দমে যাওয়ার পাত্র নয়। আমরা সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেবো না। এরপর রাত ১১টায় নগরীর জুলাই চত্বরে সংবাদ সম্মেলনে আখতার হোসেন বলেন, এমদাদুল হক ভরসা বলেছেন বিএনপি’র হাই কমান্ডের নির্দেশনায় তারা এ আন্দোলন করছে। তাই রংপুর-৪ আসনের হারাগাছ পৌরসভায় এনসিপি’র নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মোটরসাইকেলে আগুন দেয়া ও স্বর্ণালংকার চুরির দায়ভার তারেক রহমানকেই নিতে হবে। আজ এই পরিস্থিতির দায় তারেক রহমানের।
ওদিকে, রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে ভোটের কারচুপির মাধ্যমে জামায়াত প্রার্থীকে জয়ী করার অভিযোগে এনে বিক্ষোভ করেছে সহস্রাধিক বিএনপি’র নেতাকর্মীসহ ভোটার। সন্ধ্যায় তারা পীরগঞ্জ বাজার এলাকায় বিক্ষোভ করে উপজেলা পরিষদ ঘেরাও করে। রাতে উপজেলা প্রেস ক্লাবে বিএনপি প্রার্থী সাইফুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে জানান, শহীদ আবু সাঈদ জীবন দিয়েছিল সুষ্ঠু ভোটের জন্য। তার জন্মভূমিতে নির্বাচনের ফলাফলকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। প্রশাসন একটি দলের পক্ষ গ্রহণ করেছে। তাই ভোট পুনঃগণনা না হওয়া পর্যন্ত বেসরকারি ফলাফল স্থগিত করা ও সরকারি ফলাফল ঘোষণা না করার আহ্বান জানাচ্ছি। সেইসঙ্গে ন্যায়বিচারের স্বার্থে ভোটের ফলাফল পুনঃগণনার অনুরোধ করছি। কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে রংপুর জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা তৎপর রয়েছি।
