সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার একমাত্র ৫০ শয্যাবিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর তীব্র সংকট বিরাজ করছে। মঞ্জুরকৃত পদের তুলনায় বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। ১৯৭৮ সালে এ উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি স্থাপিত হলেও এখনো আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন হাওরাঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে ভোগান্তিতে পড়ছেন শিশুসহ গর্ভবতী মায়েরা। তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ২৪টি চিকিৎসকের পদ মঞ্জুর থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ছয়জন। ফলে এখানে ১৮টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অবস, এনেস্থেসিয়া) পদে ৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন। এ ছাড়া, ১৩টি মেডিকেল অফিসারের পদের মধ্যে কর্মরত আছেন দুইজন। ফলে এখানে ১১টি পদ শূন্য রয়েছে। ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসারের আটটি পদের একটিও বর্তমানে পূরণ হয়নি। অন্যদিকে, আবাসিক মেডিকেল অফিসারের একটি পদ পূরণ হলেও জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের অভাবের কারণে রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে। জুনিয়র কনসালটেন্ট (এনেস্থেসিয়া) পদে একজন চিকিৎসক সংযুক্তিতে সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালে কর্মরত থাকায় স্থানীয়ভাবে সেই পদটিও কার্যত শূন্য রয়েছে। নার্স ও মিডওয়াইফ পদেও রয়েছে ঘাটতি। মোট ১৯টি নার্স ও মিডওয়াইফ পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৩ জন। শূন্য রয়েছে ৬টি পদ। এর মধ্যে তিনজন সিনিয়র স্টাফ নার্স শিক্ষা ছুটিতে থাকায় বাস্তবে কর্মরত নার্সের সংখ্যা আরও কমে গেছে। এ ছাড়া, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট পদে মোট ৬টি পদের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১ জন এবং ৫টি পদ শূন্য রয়েছে। ল্যাব, ডেন্টাল ও রেডিওলজি বিভাগে প্রয়োজনীয় টেকনোলজিস্ট না থাকায় রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। ছাত্রদল নেতা রাহুল জানান, চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে হাসপাতালে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিকিৎসাসেবা মিলছে না। বিশেষ করে জরুরি বিভাগ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাবে রোগীরা জেলা সদর বা সিলেটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক জানান, প্রতিদিন শিশু ও নারীসহ অসংখ্য রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসছেন। চিকিৎসক ও জনবল সংকটের কারণে তাদের স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চিকিৎসা নিতে আসা আসমা বেগম জানান, চিকিৎসক সংকট এখানে নিত্যদিনের ঘটনা। একটু জটিল রোগী হলেই এখান থেকে রেফার করে দেয়া হয়। গর্ভবতী মায়ের চিকিৎসাও অনেক সময় এখানে করানো যায় না। সিজারের প্রয়োজন হলে তাদের জেলা শহর অথবা সিলেটে নিয়ে যেতে হয়। তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি অনেক পুরনো। এখানে ভবন আছে, চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা আছে, রাস্তাঘাট আগের চেয়ে অনেক ভালো। তবুও কেন চিকিৎসকরা এখানে আসেন না বা থাকেন না- তা বুঝতে পারছি না। তিনি দ্রুত চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দিতে নতুন সরকারের কাছে জোর দাবি জানান। তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নওশাদ আহমেদ বলেন, শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চাহিদা পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হলে এখানে স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নত হবে। সুনামগঞ্জ সিভিল সার্জন জসিম উদ্দিন বলেন, বারবার চাহিদা পাঠিয়েও আমরা চিকিৎসক পাচ্ছি না। একই চিত্র আরও কয়েকটি উপজেলায়। তিনি বলেন, উপর থেকে জানানো হয় তাহিরপুরে চিকিৎসক যেতে চান না। তবে এখানে জরুরি ভিত্তিতে চিকিৎসক প্রয়োজন। স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল মানবজমিনকে বলেন, তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার চেষ্টা চলছে, যাতে স্থানীয় মানুষজন ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
২৪ পদের বিপরীতে কর্মরত ৬ জন
তাহিরপুরে চিকিৎসক সংকট ভয়াবহ, স্বাস্থ্যসেবা ঝুঁকির মুখে
এম এ রাজ্জাক, সুনামগঞ্জ থেকে
১৩ এপ্রিল (সোমবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
