জুলাই অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে সংবিধানে বেশ কিছু পরিবর্তন এনে অধ্যাদেশ জারি হয়। কথা ছিল- নির্বাচিত সরকার গঠন করার পর সংসদ শুরুর এক মাসের মধ্যেই সেগুলো পাস করা হবে। কিন্তু এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশ বাতিল হচ্ছে। ফলে দুদক গঠনের ক্ষেত্রে পুরনো রীতিই বহাল থাকছে। অর্থাৎ নতুন
অধ্যাদেশে পাঁচজন নিয়ে কমিশন গঠন করার কথা থাকলেও তা আর হচ্ছে না। এক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের নেতৃত্বেই চলবে দুদক। সংবিধান অনুযায়ী, এ সময়ে মধ্যে রাষ্ট্রপতির জারি করা কোনো অধ্যাদেশ যদি সংসদে অনুমোদন না হয়, তাহলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। সেই হিসেবে দুদক (সংশোধন) অধ্যাদেশটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হতে পারে। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫ অনুযায়ী পাঁচজনের কমিশন নয়; দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ অনুযায়ী আগের মতোই কমিশন হবে তিনজনের।
অন্তর্বর্তী সরকারের করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে বেশ কিছু অধ্যাদেশ রহিত করতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। এর মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশটি রয়েছে। এ অধ্যাদেশটি বাতিলের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন জার্মানভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবি। দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের বিষয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
এ বিষয়ে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হয়ে নির্বাচন করা ডা. তাসনিম জারা তার ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে বলেন, দুদককে নখদন্তহীন করে রাখার পুরনো সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়া কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় শুভবুদ্ধির পরিচায়ক হতে পারে না।
অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন। তিনি বলেন, অধিকতর আলোচনার অজুহাতে আইনটি বাতিল করে পুরনো ব্যবস্থাকে ফিরিয়ে আনবেন না। আইনটিকে আরও শক্তিশালী করতে চাইলে পরবর্তীতে সংসদে সংশোধন আনুন; কিন্তু এ কথা বলে প্রতিষ্ঠানকে পঙ্গু করে রাখবেন না। তবে এসব প্রতিবাদ তোয়াক্কা না করে অবশেষে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশটি বাতিলই হতে যাচ্ছে। যদিও সংশোধিত অধ্যাদেশে কমিশনারদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে তিন থেকে পাঁচজনে উন্নীত করা, দুদকের জনবল কাঠামো, অনুসন্ধান-তদন্তসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবর্তন করা হয়। এ অধ্যাদেশটি বাতিল হলে আগের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন-২০০৪ বহাল থাকবে।
গত ৩রা মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার সবাই একসঙ্গে পদত্যাগ করেন। এরপর এক মাসের বেশি সময় ধরে দুদকে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। দুর্নীতির অভিযোগ, মামলা ও তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ই মূলত দুদকের প্রধান কাজ। কমিশন শূন্য থাকায় দুর্নীতির নতুন কোনো মামলা ও তদন্ত রিপোর্ট অনুমোদন হচ্ছে না। এমনকি নতুন অনুসন্ধান গ্রহণ করতে পারছে না দুদক।
সাবেক সচিব মোহাম্মদ আব্দুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন সপ্তম কমিশন বিদায়ের পর এখন অষ্টম কমিশন নিয়োগ দেবে সরকার। নতুন কমিশন গঠনের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ এর ৬ ধারায় কমিশনারদের নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাবেন তারা। এ আইনের ৭ ধারা অনুযায়ী কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে পঁাঁচ সদস্যের একটি বাছাই কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি ও হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতি, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব বাছাই কমিটির সদস্য হবেন। তবে তাকে না পাওয়া গেলে বা অসম্মত হলে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব সদস্য হবেন। আপিল বিভাগের বিচারপতি এ কমিটির সভাপতি হবেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বাছাই কমিটির কার্যসম্পাদনে প্রয়োজনীয় সাচিবিক সহায়তা করবে। কমিশনার নিয়োগে সুপারিশের উদ্দেশ্য বাছাই কমিটির সদস্যদের মধ্যে কমপক্ষে তিনজনের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের জন্য দু’জন ব্যক্তির নামের তালিকা প্রণয়ন করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে। এ তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতির এখতিয়ার মোতাবেক তিনজনকে দুদকে নিয়োগ দেবেন।
থমকে আছে কার্যক্রম
কমিশন ভেঙে যাওয়ার পর দ্রুত নতুন কমিশন গঠনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়নি। ফলে দুদকে নতুন কোনো অনুসন্ধান অনুমোদন হচ্ছে না। বেশ কিছু প্রতিবেদনের কাজ শেষ হয়ে থাকলেও মামলার অনুমোদন হচ্ছে না। অন্যদিকে মামলা হয়েছে কিন্তু তদন্ত কার্যক্রমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কমিশন না থাকায়। এ ছাড়া, দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পদ জব্দ, বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞাসহ নানা কার্যক্রম থমকে আছে কমিশনের অপেক্ষায়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দ্রুত কমিশন নিয়োগ না হলে অনেক দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি বিদেশ পালিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একাধিক আইনজীবী বলেন, নতুন মামলা গ্রহণ, অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু, এমনকি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অনুমোদনও দেয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে চলমান হাজার হাজার মামলা ও তদন্ত কার্যক্রম থমকে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নতুন নেতৃত্বের অপেক্ষায় থাকলেও অনিশ্চয়তা কাটছে না। কমিশন না থাকায় নতুন তদন্ত, অনুসন্ধান অনুমোদন বা চার্জশিট দাখিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যদিও আগে অনুমোদিত কিছু তদন্ত সীমিত পরিসরে চলমান আছে। তবে নতুন বড় কোনো দুর্নীতির মামলার অনুমোদন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এ সুযোগে দুর্নীতিবাজরা তাদের অবৈধ সম্পদ গোপনে স্থানান্তর, বিক্রি কিংবা বিদেশে পাচার করে দিতে পারে। এতে দেশের দুর্নীতি দমন প্রক্রিয়া আরও দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দুদকের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, সরকারের নিশ্চয়ই এ বিষয়ে পরিকল্পনা রয়েছে। দুদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন অচলাবস্থা চলতে পারে না- এমনটাই তাদের প্রত্যাশা।
