চূড়ান্ত যুদ্ধ বিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা

ফন্ট সাইজ:

টানা ৪০ দিন তুমুল সংঘাতের পর যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান। তবে একদিন না যেতেই বৃহস্পতিবার ইসরাইলের বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ এনেছে তেহরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহ। বুধবারের মতো বৃহস্পতিবারও দক্ষিণ লেবাননে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে আড়াই শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। ওই হামলায় হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমকেও হত্যার দাবি করেছে ইসরাইল। তেল আবিব ও যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, যুদ্ধবিরতির শর্তে হিজবুল্লাহর কথা নেই। কিন্তু মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতির শর্তের আওতায় হিজবুল্লাহও রয়েছে। বৃটেন ও ফ্রান্স হিজবুল্লাহকে চুক্তির আওতায় আনার আহ্বান জানালেও তা অস্বীকার করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। লেবাননের যেখানে প্রয়োজন সেখানে হামলা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। নেতানিয়াহুর বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে ব্যাপক হামলা অব্যাহত রেখেছে। যাতে প্রাণ হারাচ্ছে বেসামরিক মানুষ। এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। বলেছেন, সামরিক আগ্রাসন গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এ ভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠা হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের প্রতিনিধিদের যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে তা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার তেহরান থেকে একটি প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছানোর কথা।

এদিকে তেহরান জানিয়েছে, লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে কোনো চুক্তি করবে না। এ ছাড়া ইসরাইলের হামলার জেরে বৃহস্পতিবার হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে তেহরান। বিশ্লেষকরা বলছেন এই সংকট মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। ফলে চলমান যুদ্ধবিরতি ফলপ্রসূ নাও হতে পারে।
অনিশ্চয়তায় ইসলামাবাদের আলোচনা: ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনাকে সামনে রেখে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি সম্পন্নের কথা জানিয়েছে পাকিস্তান সরকার। এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বলয় জোরদার করেছে দেশটি। পাঁচ তারকা বিলাসবহুল সেরেনা হোটেলের আশপাশের ৩ কিলোমিটার জুড়ে দুইদিনের লকডাউন দেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিরা এই হোটেলেই অবস্থান করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি খোলার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। যা ওই আলোচনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, লেবাননকে ইসরাইলি হামলার মুখে রেখে কোনোভাবেই আলোচনার টেবিলে যাবে না তারা। হরমুজ প্রণালি না খোলায় বৃহস্পতিবার তেলের মূল্য ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছায়। এ ছাড়া জেট ফুয়েলসহ আরও কিছু পণ্যে মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানে হামলা শুরুর পর গত মাসে একই সঙ্গে লেবাননের হিজবুল্লাহ’র ওপর হামলা শুরু করে ইসরাইল। মঙ্গলবার ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা দেয়ার পর নেতানিয়াহু জানায় যে, হিজবুুল্লাহ এর আওতাধীন নয়। ওয়াশিংটনও একই কথা বলেছে। এদিকে লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছে বৃটেন ও ফ্রান্স।

যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ লেবানন: ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, লেবাননে ইসরাইলি হামলা ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। এর ফলে আলোচনাগুলো অর্থহীন হয়ে যাবে। পেজেশকিয়ান আরও বলেন, ইরান লেবাননের জনগণের সঙ্গেই থাকবে। এদিকে লেবানন যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, লেবানন এবং সমগ্র প্রতিরোধ অক্ষ, ইরানের মিত্র হিসেবে যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে।

হিজবুল্লাহ প্রধান কাসেমকে হত্যার দাবি ইসরাইলের: হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইসরাইল। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলের হামলায় হিজবুল্লাহ’র এই নেতা নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে তা ইরান ও হিজবুল্লাহ’র জন্য বড় ধাক্কা হবে। হিজবুল্লাহ মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অন্যতম মিত্র। ২০২৪ সালে কাসেমের পূর্বসূরি হিজবুল্লাহ’র প্রবীণ নেতা হাসান নাসরুল্লাহকে হত্যা করে ইসরাইল। এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ইসরাইলের এক হামলায় ২৫০ জনের বেশি লেবানিজ নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে শিশুও রয়েছে।

হামলা বন্ধে পাকিস্তানের সহায়তা চেয়েছে লেবানন:লেবাননে ইসরাইলের হামলা নিয়ে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ লেবাননের ওপর ইসরাইলের চলমান আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং হামলায় প্রাণ হারানো হাজারো মানুষের জন্য গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। আলাপকালে শেহবাজ আঞ্চলিক শান্তি উদ্যোগে পাকিস্তানের সক্রিয় ভূমিকার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, এই শান্তির চেতনার অংশ হিসেবেই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনার আয়োজন করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের নিন্দা: লেবাননে ইসরাইলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। পাশাপাশি তিনি এই আগ্রাসনকে আঞ্চলিক শান্তির জন্য গুরুতর হুমকি বলে উল্লেখ করেছেন। এক বিবৃতিতে গুতেরেস বলেন, ৮ই এপ্রিলের হামলায় শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে শিশুও রয়েছে। এসব হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে, যা গভীর উদ্বেগজনক। মহাসচিব নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশ এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। একই সঙ্গে তিনি লেবাননের সরকার ও জনগণের প্রতি সমবেদনা জানান। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, লেবাননে ইসরাইলের চলমান সামরিক অভিযান ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির চুক্তি ব্যাহত করতে পারে। এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরির উদ্দেশ্যে নেয়া হয়েছিল। গুতেরেস সব পক্ষকে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, চলমান সহিংসতা শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। তিনি আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে মানবিক আইন মেনে চলার ওপর জোর দেন এবং বেসামরিক নাগরিক ও স্থাপনায় হামলাকে অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই সংঘাতের কোনো সামরিক সমাধান নেই। পরিশেষে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ পূর্ণ বাস্তবায়নের আহ্বান জানান, যা লেবাননের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সংঘাত বন্ধের কথা বলে।

আলোচনায় কারা থাকবেন: সম্ভাব্য আলোচনায় অংশগ্রহণকারীদের তালিকা এখনো নির্ধারণাধীন এবং পরিবর্তন হতে পারে। তবে প্রাথমিকভাবে কিছু নাম প্রকাশ করেছে পাকিস্তান। মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তান থেকে যোগ দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, সেনাপ্রধান অসিম মুনির, উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং আইএসআই প্রধান আসিম মালিক। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যোগ দিতে পারেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, হোয়াইট হাউজের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও প্রেসিডেন্টের সাবেক উপদেষ্টা জারেড কুশনার এবং সেন্টকম কমান্ডার ব্র্যাড কুপার। তাছাড়া ইরান থেকে আলোচনায় যোগ দিতে পারেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত রাভানচি।



কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন