ভয়াবহ বন্যায় নেপালের একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত অন্ধকার সুড়ঙ্গে আটকা পড়েছিলেন সঞ্জয় শাহ। ধ্বংসস্তূপে চোখে আঘাত লাগতে পারে। এই ভয়ে দিনের পর দিন চোখ বন্ধ করে রেখেছিলেন তিনি। নয় দিন পর যখন অলৌকিকভাবে উদ্ধার করা হয় তাকে, তখন চোখ খোলাই কঠিন হয়ে পড়েছিল তার জন্য। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর শুক্রবার রয়টার্সকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমার চোখ দিয়ে দেখার মতো কিছুই ছিল না। বেশির ভাগ সময় চোখ বন্ধ করে রাখতাম। ভয় হতো, হোঁচট খেয়ে বা কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কা লেগে ভুল করে চোখে আঘাত পেতে পারি। তাই দীর্ঘ সময় চোখ বন্ধ রাখতাম। বারবার এভাবে করার পর একসময় চোখ খোলাও কঠিন হয়ে যায়।
আগস্টের শেষ দিকে হিমালয়ের একটি হিমবাহ ধসে নিচের উপত্যকাগুলোতে ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টি হয়। এতে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে অন্তত ১ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে এবং ৫ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
কাঠমান্ডুতে বোনের বাসায় এখন সুস্থ হয়ে উঠছেন ৩০ বছর বয়সী শাহ। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথরিটি পরিচালিত আপার ত্রিশুলি-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে মেকানিক্যাল ফোরম্যান হিসেবে কাজ করছিলেন। যে বহুতল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে তিনি নয় দিনের বেশির ভাগ সময় আটকা ছিলেন, সেটি পাহাড়ের গভীরে নির্মিত। শাহ জানান, তার কাছে কোনো খাবার ছিল না। বন্যার পানি এবং পাহাড়ের পাথর চুঁইয়ে পড়া পানি পান করেই তিনি বেঁচে ছিলেন।
হতাশা যখন তাকে গ্রাস করতে চাইছিল, তখন শাহ আশ্রয় নেন হিন্দু ধর্মীয় মহামন্ত্রের। শাহ স্মরণ করে বলেন, মরতেই যদি হয়, তাহলে দ্রুত হাল ছেড়ে দেয়ারই বা কী দরকার- এমনটাই ভাবতাম। তাই ঈশ্বরের নাম জপ করতে থাকি এবং মহামন্ত্র পাঠ করি। মহামন্ত্র আমাকে অন্য রকম এক অনুভূতি দিয়েছিল, প্রায় আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার মতো। আমি ভয় পাচ্ছিলাম না। বরং শান্ত ও স্বস্তি অনুভব করছিলাম।
ছয়তলা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পঞ্চম তলায় একটি খোলা জায়গা ছিল। সেখান থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে শাহ চিৎকার করে বোঝার চেষ্টা করতেন, আর কেউ বেঁচে আছে কি না। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। তিনি বলেন, শুরুতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, উদ্ধারকারী দল আসবে। দিন যতই পার হচ্ছিল, সেই বিশ্বাস অটুট ছিল। নিজেকে বারবার বলতাম, আমি একা নই। আমার পরিবার আছে, আর তারা বাইরে আমার জন্য প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছে।
তিনি বলেন, তাদের কথা ভাবলেই শক্তি পেতাম, মনোবল বাড়ত। এমনকি আমার মৃত্যু যদি নির্ধারিতও থাকে, তবু আতঙ্কিত হয়ে দ্রুত হাল ছেড়ে দেয়ার কী দরকার? তাই ঈশ্বরের নাম জপ করতাম এবং প্রার্থনা করতাম। তিনি বলেন, আমি পুরোপুরি সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি যেন অন্য কোনো জগতে বাস করছি। আমার ধারণা ছিল, মাত্র দুই বা তিন দিন পার হয়েছে। পরে যখন জানতে পারলাম আসলে ১০ দিন কেটে গেছে, তখন আমি হতবাক হয়ে যাই।
অন্ধকারের মধ্যে চলাফেরা করতে গিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন জিনিসের সঙ্গে ধাক্কা খেতেন তিনি। ধ্বংসস্তূপে কেটে যেত শরীর, কোথাও কোথাও ছিল আঁচড়ের দাগ। ভাঙা টিউবলাইটসহ বিভিন্ন জিনিস চারপাশে পড়ে ছিল। সেগুলোর কিছু তার পায়ের ভেতর ঢুকে গিয়েছিল। বন্যার পানিতে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তরের নিচে চাপা পড়ে পুরো সুড়ঙ্গটির চেহারাই বদলে যায়। শাহ বলেন, বন্যার আগে সুড়ঙ্গটির প্রতিটি অংশ আমি চিনতাম। কোনো অসুবিধা ছাড়াই অনেক ভেতরে যেতে পারতাম। কিন্তু বন্যার পর পুরো কাঠামোটাই বদলে যায়। যন্ত্রপাতি ভেসে গেছে, বাক্সপত্র ছড়িয়ে পড়েছে, দেয়াল ধসে গেছে। ধ্বংসাবশেষের কারণে কোথাও উঁচু ঢিবি, কোথাও গর্ত তৈরি হয়েছে। সুড়ঙ্গ সম্পর্কে আমার আগের পরিচিতি আর কোনো কাজে আসছিল না।
শুরুতে শাহ সুড়ঙ্গের ভেতরে চলাফেরার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পরে বুঝতে পারেন, অন্য কোথাও গেলে আরও বিপজ্জনক জায়গায় আটকা পড়তে পারেন। তাই তিনি একই জায়গায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। বলেন, তাই ফিরে এসে যে জায়গাটিকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়েছিল, সেখানেই থাকি। শেষ পর্যন্ত উদ্ধারকারীরা আমাকে সেখান থেকেই খুঁজে পান। অন্যথায় আমার কী হতো, আমি জানি না।
উদ্ধারের কয়েক ঘণ্টা আগে বাইরে থেকে নানা শব্দ শুনতে শুরু করেন শাহ। তিনি বলেন, আমি জানতাম তারা আসবে। জানতাম উদ্ধার অভিযান শুরু হবে। বাইরে কিছু শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম, অনেকটা ড্রামের গর্জনের মতো। উদ্ধারের দিন এবং তার প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আগে, পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর বাইরে থেকে শব্দ শুনতে শুরু করি। তিনি আরও বলেন, খননযন্ত্রের কাজ করার শব্দ এবং মইয়ের ধাতব অংশের ঠকঠক শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। উদ্ধারের প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা আগে পরিষ্কারভাবে মানুষের কাজ করার শব্দ শুনতে পাই। এতে সত্যিই আমার আশার সঞ্চার হয়।
