জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা এবং ভূগর্ভস্থ পানির সীমিত হওয়ার কারণে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির সংকট ভয়াবহ মাত্রা নিয়েছে। বিশেষ করে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার গ্রামাঞ্চলগুলোতে পানি সংগ্রহ প্রতিদিনের একটি কষ্টকর চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের মানুষ প্রতিদিন সকালে সূর্যোদয়ের আগে থেকে জল সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে বাধ্য হচ্ছেন। পুকুর, নলকূপ ও টিউবওয়েলের অধিকাংশ পানি লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় তা মানুষের পানির যোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ পানির সহজলভ্যতা হারিয়ে গেছে।
এই সংকট শুধু দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করছে না, বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। পরিবারগুলোকে প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে পানি আনার জন্য সময়, শ্রম এবং অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, নারীরা সময়ের অভাবে জীবিকার অন্যান্য কাজ করতে পারছেন না এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে—বিশেষ করে প্রজনন স্বাস্থ্য, ডায়রিয়া, চর্মরোগ এবং অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি প্রবলভাবে বাড়ছে। এছাড়া, কৃষিজমি, গবাদি পশুর ও সেচের জন্যও নিরাপদ পানির অভাব বেড়েছে, যা স্থানীয় খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এ ধরনের তীব্র পানি সংকট কেবল একটি প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, এটি সামাজিক অসাম্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। নারী ও শিশুদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
এমন বাস্তবতায় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা Rupantar-এর বাস্তবায়িত GO4IMPact Project প্রকল্প এলাকায় ভিন্নধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রকল্পের আওতায় উপকূলীয় অঞ্চলে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে স্থাপন করা হয়েছে রিভার্স অসমোসিস (RO) প্ল্যান্ট, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা (রেইনওয়াটার হার্ভেস্টিং), পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (PSF), মিষ্টি পানির আধার সংরক্ষণ, মিনি ওয়াটার পাইপ নেটওয়াক© এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম।
এর পাশাপাশি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা)- এর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে পানি সংকট মোকাবেলায় টেকসই ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ভিশন পরিকল্পনা (Vision Planning), পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ক সক্ষমতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, বাজেট পরিকল্পনায় পানি বিষয়ক অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং বহুবর্ষী উন্নয়ন পরিকল্পনায় (Multi-year Plan) নিরাপদ পানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার মতো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
আশাশুনি উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম হোসেনুজ্জামান বলেন, “আগে পানি সমস্যাকে আলাদা করে উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হতো না। এখন প্রকল্পের সহায়তায় আমরা বাজেটে পানি খাতকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি এবং নিজস্ব তহবিল থেকেও উদ্যোগ নিচ্ছি।”
একই সঙ্গে সিভিল সোসাইটি সংগঠনগুলো (CSO) স্থানীয় জনগণকে সংগঠিত করে পানি অধিকার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কমিউনিটি গ্রুপ, ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট কমিটি এবং নারী নেতৃত্বাধীন দল গঠন করে তারা নিরাপদ পানির দাবিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ করছে। অনেক এলাকায় সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি ও গণস্বাক্ষর সংগ্রহের মাধ্যমে পানি সংকটের বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
স্থানীয় এক নারী সংগঠক শরীফা খাতুন বলেন, “আগে আমরা পানি সমস্যার কথা বলার সুযোগ পেতাম না। এখন সংগঠিতভাবে দাবি জানাতে পারছি এবং ইউনিয়ন পরিষদও বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছে। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী প্রচারনার ইশতেহারে পানি সমস্যার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করছে।”
স্থানীয়রা বলছেন, এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত পরিসরে নেওয়া প্রয়োজন, যাতে এলাকার সকলেই নিরাপদ পানির আওতায় আসতে পারেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের প্রত্যাশা টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হোক। উপকূলের এই সংগ্রাম কেবল পানির নয়, টিকে থাকাও। আর সেই সংগ্রামে নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে GO4IMPact Project প্রকল্পের উদ্যোগগুলো। (বিজ্ঞপ্তি)
উপকূলের লবণাক্ততার মাঝে নিরাপদ পানির খোঁজে নতুন আশা
বিবিধ
৩ মাস আগে
৯ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার), ২০২৬, ৩ঃ১৯ (অপরাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
