বিজয় থেকে দায়িত্বে: ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর বিএনপির নতুন পরীক্ষা

বিজয় থেকে দায়িত্বে: ত্রয়োদশ নির্বাচনের পর বিএনপির নতুন পরীক্ষা

ফন্ট সাইজ:

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অর্জিত এই বিজয়ের জন্য বিএনপি ও তাদের মিত্রদের আন্তরিক অভিনন্দন। জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়, এই বিজয় শুধু একটি দলের নয়, বরং একটি প্রত্যাশার বিজয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, আন্দোলন, অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার পর জনগণ যে রায় দিয়েছে, তা দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রেক্ষাপটে অতীতের দিকে ফিরে তাকানো জরুরি, কারণ ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতের পথরেখা আঁকা সম্ভব।

বাংলাদেশের জন্ম এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। পাকিস্তানি শাসকদের শোষণ, বৈষম্য ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায়। সেই স্বাধীনতা কেবল একটি ভূখণ্ডের অর্জন নয়, বরং একটি জাতির আত্মমর্যাদার প্রতিষ্ঠা। কিন্তু স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল বাস্তবতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং অভ্যন্তরীণ সংকট আমাদেরকে দেখিয়েছে যে বিজয় অর্জনের চেয়ে বিজয়কে সুরক্ষিত রাখা আরও কঠিন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নেতৃত্বের ভুল, অদূরদর্শিতা কিংবা সুশাসনের ঘাটতি কখনও কখনও ভয়াবহ মূল্য দাবি করে।

পরবর্তী সময়ে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে একটি নতুন ধারার সূচনা করেন। তার শাসনামলকে অনেকেই উন্নয়নের সূচনা হিসেবে দেখেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় দৃঢ়তা, দেশপ্রেম এবং কর্মমুখী উদ্যোগ তাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। তার পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের দীর্ঘ অধ্যায় দেশকে বিতর্কের মুখেও ফেলেছে। এই সময়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কিছু সংস্কার হলেও গণতান্ত্রিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে নব্বইয়ের দশকে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়। ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক পালাবদল, হরতাল, বিরোধ এবং সমঝোতার মধ্য দিয়েও গণতান্ত্রিক কাঠামো টিকে ছিল। তবে এই সময়কালও ছিল সংঘাতময়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক দুর্বলতা গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিকে দুর্বল করেছে। পরবর্তীকালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অগ্রগতি সাধন করলেও শাসনব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছিল। উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা যে কতটা জরুরি, তা এই সময়ের অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। অসংখ্য তরুণ প্রাণের আত্মত্যাগ, নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং গণমানুষের প্রত্যাশা একটি পরিবর্তনের পথ তৈরি করে। এই আন্দোলনের অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে যে কোনো গণআন্দোলনের পরবর্তী সময়ে আবেগ ও প্রতিশোধপরায়ণতার পরিবর্তে প্রজ্ঞা ও সংযমের প্রয়োজন হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে দেশকে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে নিয়ে যেতে ভূমিকা রেখেছে, তা ইতিহাসে ইতিবাচকভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি হচ্ছে অবাধ ভোটাধিকার এবং জনগণের আস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপির বিজয়কে কেবল রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে নয়, বরং একটি নতুন দায়িত্বের সূচনা হিসেবে মূল্যায়ন করা উচিত। ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে নির্বাচনকালীন সময় পর্যন্ত দলটির নেতৃত্ব যে ধৈর্য, সংযম ও কৌশলগত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার। টানা পনেরো বছর হামলা, মামলা ও নিপীড়নের মুখোমুখি হওয়ার পরও ৫ আগস্টের পর নানামুখী উসকানি ও প্ররোচনা সত্ত্বেও তারা সংঘাতের পথ পরিহার করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেই অবিচল থেকেছে। এ জন্য দলটির নেতৃত্বকে আন্তরিক অভিনন্দন। তবে বিজয়ের উচ্ছ্বাসে আত্মতুষ্টি বা আত্মভোলাভাব যেন স্থান না পায়, এই সতর্কতাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

রাজনৈতিক ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে ক্ষমতা মানুষকে পরীক্ষা করে। বিজয়ের পর দলের নেতা কর্মীদের আচরণই জনগণের আস্থা নির্ধারণ করে। অতীতে দেখা গেছে, দলীয় প্রভাব খাটানো, প্রশাসনে অযোগ্যদের পদায়ন, প্রতিহিংসামূলক মনোভাব এবং দুর্নীতির বিস্তার একটি জনপ্রিয় সরকারকেও দ্রুত অজনপ্রিয় করে তুলতে পারে। বিএনপির উচিত হবে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা। দলীয় স্বার্থের চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে না পারলে এই বিজয় দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

বিশেষ করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা প্রদর্শন করতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা একটি শক্তিশালী গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক সহাবস্থান ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রতিপক্ষকে দমন নয়, বরং যুক্তির মাধ্যমে মোকাবিলা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং বিনিয়োগ সংকট মোকাবিলায় বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করতে হবে। কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি। তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি না হলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে। সুশাসন ও স্বচ্ছতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।

একই সঙ্গে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতিগত বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। কোনো প্রকার উগ্রতা বা বিভাজনমূলক রাজনীতি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে। বিএনপি যেভাবে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের আস্থা অর্জন করেছে, সেই আস্থা অটুট রাখতে দলের ভেতরে সময়োপযোগী ও কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। হয়তো এটা বিএনপির জন্য সর্বশেষ সুবর্ণ সুযোগ। কেননা, এটা মানতেই হবে যে, বিএনপি নেতা-কর্মীরা যদি গতানুগতিক অগ্রহণযোগ্য কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে, তবে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তাদের প্রকৃত গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হবে না। ফলে, দলটি কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, নৈতিক অবস্থান থেকেও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রাখার সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে যাবে। অতএব, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, তরুণ নেতৃত্বের বিকাশ, নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং গণতান্ত্রিক চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মাধ্যমে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের পথ রচনা করতে হবে।

অতীতের রাজনৈতিক অধ্যায়গুলোর প্রতি সম্মান দেখিয়ে ভবিষ্যতের পথে অগ্রসর হওয়াই হবে পরিণত নেতৃত্বের পরিচয়। ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ে যেমন গৌরব আছে, তেমনি ভুলও আছে। সেই ভুলগুলো পুনরাবৃত্তি না করে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। বিজয়ের আনন্দকে দায়িত্বে রূপান্তর করতে পারলেই বিএনপি তাদের এই অর্জনকে স্থায়ী করতে পারবে।

মোটকথা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোটের বিজয় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই বিজয়ের জন্য দলকে অভিনন্দন জানিয়ে একই সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দিতে হয় যে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বড়। আইনের শাসন, সুশাসন, স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিশ্চিত করতে পারলেই এই বিজয় ইতিহাসে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যথায় ইতিহাস আবারও কঠিন বিচার করবে। এখন সময় আত্মসমালোচনা, সংযম এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের। বিজয়কে টেকসই সাফল্যে রূপান্তর করাই হোক আগামী দিনের অঙ্গীকার।


লেখক- প্রফেসর ড. খালিদুর রহমান
পরিসংখ্যান বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন