ট্রাম্পের আল্টিমেটাম তোয়াক্কা করছে না ইরান

ট্রাম্পের আল্টিমেটাম তোয়াক্কা করছে না ইরান

ফন্ট সাইজ:

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া কঠোর আল্টিমেটাম প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান, ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলসমৃদ্ধ কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে। রয়টার্সসহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। তা না হলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু ও জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানো হবে। তবে এই আল্টিমেটাম সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকি ‘অকার্যকর’ এবং এর ফলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হবে। ইরানি কর্মকর্তারা পাল্টা সতর্ক করে বলেন, এমন চাপ অব্যাহত থাকলে ‘ভয়াবহ পরিণতি’ ভোগ করতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জ্বালানি সরবরাহ হয়। সেটিকে কেন্দ্র করে এই সংঘাতের মূল সূত্রপাত। সাম্প্রতিক হামলা ও পাল্টা হামলার প্রেক্ষাপটে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। সংঘাতের পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল একযোগে ইরানের ওপর সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, প্রণালি খুলে না দিলে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হবে। একই সঙ্গে ইসরাইলও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত এবং উদ্ধার অভিযানকে ঘিরেও উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের ধারাবাহিক হুমকি ও সময়সীমা বেঁধে দেয়া কূটনৈতিক সমাধানের পথকে আরও সংকুচিত করছে। ইতিমধ্যে একাধিক দফা আলোচনা হলেও কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। বরং উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। বিশ্ববাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় তেলের দাম বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

আল্টিমেটাম শেষ কখন: গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ইরানকে একটি চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার জন্য ফের ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেন। তেহরানের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে হুঁশিয়ারিও করেন তিনি। ইরান যদি এই সময়সীমার মধ্যে একটি চুক্তি করতে ব্যর্থ হয় বা গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয় তাহলে দেশটিতে আরও তীব্র হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি। এর আগে মার্চেও ইরানকে একটি চুক্তি করে যুদ্ধ শেষ করার ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু ওই সময়সীমা পার হওয়ার আগেই ইরানকে আরও ১০ দিন সময় দেন তিনি। এবার ওই ১০ দিনের শেষ ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়া শুরু হয়েছে। শনিবার নিজের সামাজিক মাধ্যমে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প বলেন, স্মরণ করুন যখন আমি ইরানকে একটি চুক্তি করার জন্য অথবা হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার জন্য ১০ দিন সময় দিয়েছিলাম। সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে- তাদের ওপর নরক নেমে আসার আগে ৪৮ ঘণ্টা আছে। ৬ই এপ্রিল, সোমবার ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় রাত ৮টায় এই সময়সীমা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

আল্টিমেটাম প্রত্যাখ্যান, পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি: ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে একের পর এক হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। সর্বশেষ হুমকিতে তিনি তেহরানকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছেন। বরাবরের মতো তার এই হুমকি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। পাল্টা বিবৃতিতে ট্রাম্পকে ‘উদ্বিগ্ন ও অসহায়’ বলে উল্লেখ করেছে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দেশ। ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আবদুল্লাহি রোববার এক বিবৃতিতে বলেছেন, যদি আমেরিকান ও জায়নবাদী শত্রুরা আগ্রাসন চালায়, তাহলে আমরা অবিরাম ধ্বংসাত্মক প্রতিশোধমূলক হামলা চালাবো। আরেক কর্মকর্তা বলেছেন, যদি মার্কিন হামলা আরও বৃদ্ধি হয় তাহলে অঞ্চল জুড়ে তাদের জন্য নরক নেমে আসবে।

মার্কিন পাইলট উদ্ধারকারী একাধিক বিমান ভূপাতিতের দাবি: ইরানের ইসফাহান শহরে আটকে পড়া পাইলটকে উদ্ধারের লক্ষ্যে পরিচালিত অভিযানে অংশ নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক বিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে তেহরান। রোববার দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূপাতিত যানের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দু’টি সি-১৩০ সামরিক পরিবহন বিমান এবং দু’টি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। এর আগে শনিবার রাতে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, শুক্রবার ইরানে ভূপাতিত হওয়া একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের দ্বিতীয় পাইলটকেও উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথমজনকে তার আগের দিন উদ্ধার করা হয়। পৃথক এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী ও বিপ্লবী গার্ড জানিয়েছে, ইসফাহান প্রদেশে একটি ইসরাইলি হারমিস-৯০০ ড্রোন এবং একটি মার্কিন এমকিউ-৯ ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে এসব দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। ইরানের আধা-সরকারি ফারস সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যা থেকে তিনটি প্রদেশে মার্কিন অনুসন্ধান অভিযান পরিচালিত হয়। প্রদেশগুলো হলো- চাহারমাহাল ও বাখতিয়ারি, কোহগিলুয়ে ও বয়ার আহমাদ এবং ইসফাহান।

আরেকটু হলেই আটক হতেন মার্কিন পাইলট: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের পাইলট আরেকটু হলেই আটক হতেন। তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বলেও ট্রুথ সোশ্যালের পোস্টে জানান তিনি। ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প জানান, গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার অভিযানের বর্ণনা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানি সামরিক বাহিনী বিপুলসংখ্যক সদস্য নিয়ে হন্যে হয়ে তাকে খুঁজছিল এবং প্রায় ধরে ফেলার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, মানুষ এবং সরঞ্জামÑ উভয় দিক থেকেই ব্যাপক ঝুঁকির কারণে এ ধরনের দুঃসাহসিক অভিযান সাধারণত চালানো হয় না। এটি সচরাচর ঘটে না বললেই চলে। প্রথম দফার পর দ্বিতীয় দফায় এই অভিযান চালানো হয়। আমরা দিনের আলোতেই ওই পাইলটকে উদ্ধার করেছি, যা বেশ অস্বাভাবিক ছিল।

দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে ইসরাইলিরা: ইরানে অবৈধভাবে হামলা করায় নিজ দেশেই ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার বিরুদ্ধে চলছে গণবিক্ষোভ। এতে নেতানিয়াহুর পুলিশ বাহিনী বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করেছে বলেও খবর মিলেছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিডিয়া জানিয়েছে, ইসরাইলের সাধারণ মানুষ ব্যাপক নিরাপত্তহীনতায় ভুগছে। তারা দেশ ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পালিয়ে যাচ্ছে। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজা যুদ্ধের পর থেকেই দেশ ছাড়তে শুরু করেছে ইসরাইলের নাগরিকরা। ২০২৩-২৪ সালে এক লাখের বেশি মানুষ ইসরাইল ছেড়েছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকায় তারা দেশ ছাড়ছেন। বর্তমানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তুলেছে ইরান। দেশটির ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। কারণ, ধীরে ধীরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকানোর সক্ষমতা কমে আসছে ইসরাইলের, যা ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন