আমি ’২৪ সালের নির্বাচনে ভোট দিতে এসেছিলাম। কিন্তু মনে হয়েছিল কেন এলাম? কি দরকার? এবারের ভোটের চিত্রটা ভিন্ন। আমার ভোটের দাম আছে। সকাল ৯টায় ভোটের লাইনে দাঁড়াই। তখন আমার সামনে প্রায় ৪০/৫০ জন মানুষ ছিল। হালকা রোদের আভা। আর ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম- উই ম্যাটার। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ঢাকা-১৫ আসনের ভোটার মুক্ত ইসলাম। তার সঙ্গে মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজে ভোট দিতে এসেছিলেন তার আরও চার বন্ধু। তারা ভোট শেষে সেলফিবাজিতে মেতে ওঠেন। সামিয়া ইসলাম ’২৪ গণ-অভ্যুত্থানে সম্মুখসারির যোদ্ধা ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রস্তুতি নেয়া এই শিক্ষার্থী বলেন, বাড়িতে মিথ্যা কথা বলে আন্দোলনে যেতাম। বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে স্লোগান দিয়েছিলাম। এই যে আঙ্গুলের কালি, এটা শুধু কালি নয়। এটা সিম্বল অব পাওয়ার।
তরুণরা উচ্ছ্বসিত। উদ্বেলিত। তারা ভোট দিচ্ছেন হাসিমুখে। তাদের ভোটের মূল্য আছে। তারা এই ভোটের জন্যই লড়াই করেছেন। জমজমাট ভোটের ময়দান। ঢাকা আসনের ভোটে চোখ ছিল গোটা দেশের। এই আসন থেকে লড়াই করেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। ঢাকার মধ্যবিত্তদের আবাসিক আধিক্য এই এলাকার ভোটাররা সুষ্ঠু সুন্দরভাবে ভোট দেন। বিচ্ছিন্ন কিছু আপত্তি-অভিযোগ ছাড়া সাজানো-গোছানো হয়েছে ভোটগ্রহণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে সেনাবাহিনীর শক্ত অবস্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। ভোটের মাঠে তরুণদের বিশেষ করে জেনজি’দের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো। জাহানারা প্রি-ক্যাডেট স্কুলের সামনে বন্ধুদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন মেডিকেল শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ। তারা ছয়জন ভোট দিতে যান একসঙ্গে। কে কাকে ভোট দিলেন- এ নিয়ে নিজেদের মধ্যে চলছিল খুনসুটি। আবরার বলেন, জেনজি’রা পারে। তারা আওয়ামী লীগের মতো শক্ত পাথরকে সরাতে পেরেছে। দেশ গড়তেও পারবে। যারাই সংসদ সদস্য হবেন, তাদের জবাবদিহিতার মধ্যে থাকতে হবে। আমরা জবাবদিহিতা আদায় করে নেবো। আমরা কোনো দল বুঝি না। পাশ থেকে তার বন্ধু মিরা বলেন- গেম অন।
ঢাকা-১৫ আসনের সরজমিন ১৮টি ভোটকেন্দ্রেই তাদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে দেখার মতো। হালিম ফাউন্ডেশন মডেল হাইস্কুলে ভোট দেয়া সামাওয়াত হোসেন বলেন, অনেকেই বলেন দেশ বদলাবো। এ করবো, ও করবো। আমি সেলফিস। আমি কারও জন্য লড়াই করি নাই। আমি আমার নিজের জন্য লড়াই করেছি। আমি আমার ভাগ্য আমার ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের জন্য লড়াই করেছি। আমি বিশ্বাস করি আমার ভবিষ্যৎ যোগ্যতায় হলে দেশটাও বদলে যাবে। বৃহস্পতিবার ভোটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভোটার, নেতাকর্মী, প্রিজাইডিং অফিসারসহ সংশ্লিষ্টরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। সকালে মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজে ভোট দেন আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন এবং বলেন, ছোটখাটো অনিয়ম হলে অগ্রাহ্য করবো, বড় বিষয় হলে ছাড় দেবো না। ভোট যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় তাহলে আমরা মেনে নেবো, অন্যদেরও মানতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেড় যুগ পর ভোট দিতে পেরে শুকরিয়া আদায় করছি। আমি আশা করছি এই ভোটের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশ গঠিত হবে। যে সরকার হবে সবার সরকার, কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের হবে না।
বেলা আড়াইটার দিকে মনিপুর স্কুল এন্ড কলেজ (বালিকা শাখা) পরিদর্শনে আসেন বিএনপি প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তিনি বলেন, আমি সব কেন্দ্রে ঢুকতে পারিনি এখনো। যেটি বললাম- লাইন দীর্ঘ, ভোট স্লো করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের অনেক বছর পর একটা ভোট, ভোট থেকে যাতে কেউ বঞ্চিত না হয়- এই আহ্বান জানান এবং জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেন। এমনকি এই আসনের জামায়াত এবং বিএনপি প্রার্থী একটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে হাস্যোজ্জ্বলভাবে কোলাকুলি ও সৌহার্দ্য বিনিময় করেন।
এদিকে, দুপুর ২টার দিকে কাজীপাড়া সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন শামীমা হোসেন। তার অভিযোগ, তিনি ভোট দিতে গেলে জানানো হয় তার ভোট দেয়া হয়ে গেছে। তাকে জানানো হয়, চেহারা মিল থাকায় অন্য কেউ ভোট দিয়ে গেছেন। তার সঙ্গে খারাপ আচরণও করা হয়। এরপর গণমাধ্যমকর্মীরা সেখানে গেলে সেই কর্মকর্তা বলেন, ওনার ভোটের ক্ষেত্রে আগেই টিক চিহ্ন দেয়া ছিল। বিষয়টি কী হয়েছে আমি জানার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু তিনি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করেন। এরপর আমি প্রিজাইডিং অফিসারকে ডাকতে যাই। কিন্তু এরইমধ্যে তিনি চলে যান। এরপর সেনা সদস্যরা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন। এই ভোটারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে ভোটকেন্দ্রের সামনের সড়কে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের কর্মীরা মুখোমুখি অবস্থান নেন। এখানেও সেনা ও বিজিবি সদস্যরা দু’পক্ষকেই নিবৃত করেন। শক্তভাবে মব দমন করে কেন্দ্রটিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন। এ ছাড়াও আরেকটি ভোটকেন্দ্রে সেনা সদস্যরা একজন বিএনপি’র নেতাকে কেন্দ্রের ভেতরে আঘাত করে কেন্দ্র থেকে বের করে দেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধমে ছড়িয়ে পড়ে। ভোটগ্রহণের পর চারটি কেন্দ্রের সামনে স্বস্তিকর পরিবেশ বিরাজ করছিল। ধানের শীষ-জামায়াত দু’পক্ষের নেতাকর্মীরা কেন্দ্রের সামনে অবস্থান করছিলেন। তবে শেষ সময়ে মনিপুর বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে দু’পক্ষের উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল। সে সময় অ্যাকশনে যায় সেনাবাহিনী এবং দু’জনকে আটক করে।
এই আসনে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা হলেন- সিপিবি’র আহাম্মদ সাজেদুল হক, জাতীয় পার্টির মো. সামসুল হক, বাংলাদেশ জাসদের মো. আশফাকুর রহমান, জনতার দলের খান শোয়েব আমান উল্লাহ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মোবারক হোসেন ও আমজনতার দলের মো. নিলাভ পারভেজ। আসনটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড (মিরপুর-কাফরুল) নিয়ে ঢাকা-১৫ আসন গঠিত। তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, মিরপুর-১০, মিরপুর-১৪, কচুক্ষেত ও পূর্ব সেনপাড়াসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এ আসনে পড়েছে। এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন, যার মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯০২ জন। অর্থাৎ মোট ভোটের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী।
ঢাকা-১৫
ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে বুঝলাম ‘উই ম্যাটার’
পিয়াস সরকার
১৩ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
