সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম ভোটে সুবিধাজনক অবস্থানে বিএনপি। তবে ইসলামপন্থিদের উত্থানের সম্ভাবনাও জোরালো। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশিরা সাম্প্রতিক বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন। ১৫ বছর ধরে কঠোর শাসন চালানো হাসিনার অধীনে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে অবাধ ও সুষ্ঠু বলে বিবেচিত হয়নি। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে অনলাইন ফরেন পলিসিতে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দক্ষিণ এশিয়া রাউন্ডআপে এসব কথা লিখেছেন লেখক এবং আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান। তিনি প্রায় দুই দশক ধরে আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছেন। এর আগে তিনি উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউট পরিচালনা করেছেন। তিনি আরও লিখেছেন, নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা থাকলেও প্রচারণাকাল তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল এবং জনমনে ইতিবাচক প্রত্যাশা দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের জরিপে ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন তারা ভোট দেয়ার ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। আর ৮০ শতাংশ আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।
তবে বিতর্কও রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষিদ্ধ করেছে। ফলে দেশের অন্যতম বৃহৎ দল নির্বাচনের বাইরে। এ অনুপস্থিতির বড় সুবিধাভোগী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বিএনপি দেশের আরেকটি বড় উত্তরাধিকারভিত্তিক দল। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ দমনপীড়নের পরও তাদের রয়েছে বিশাল সমর্থকগোষ্ঠী ও আর্থিক সামর্থ্য। লন্ডন থেকে নির্বাসন শেষে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা দলকে নতুন উদ্দীপনা দিয়েছে। তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫ সালে মারা যান।
তবে বড় পরিবর্তন আসতে পারে অন্য দিক থেকেও- যদি ঐতিহ্যগতভাবে জোটের ছোট অংশীদার হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়।
জামায়াতের বিতর্ক ও পুনরুত্থান: জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দমনে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে, যা বহু গবেষকের মতে গণহত্যার পর্যায়ে পৌঁছেছিল। দলটির অতীতে সন্ত্রাসবাদ-সম্পর্কিত যোগসূত্রও ছিল। তাদের সাবেক নেতা মাওলানা সাইদুর রহমান পরে জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত হন।
তবে শেখ হাসিনার পতনের পর দলটির রাজনৈতিক অবস্থান বদলাতে শুরু করে। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। গত সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের জয় ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে তরুণদের অগ্রণী ভূমিকার প্রেক্ষাপটে।
দলটি নিজেকে দুর্নীতিবিরোধী ও জনকল্যাণমুখী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে জনঅসন্তোষের প্রেক্ষাপটে কার্যকর বার্তা। ২০২৪ সালের আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত নতুন দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টিও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দিয়েছে। দীর্ঘদিনের বাংলাদেশ বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের মতে, সময়ের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ‘কলঙ্ক’ দুর্বল হয়ে আসা, ভারতবিরোধী মনোভাবের বৃদ্ধি এবং পুরনো পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রাজনীতি প্রত্যাখ্যানের ভাবমূর্তি- এসবই জামায়াতের প্রতি সমর্থন বাড়িয়েছে। দলটি কিছু ক্ষেত্রে তুলনামূলক মধ্যপন্থি অবস্থানও নিয়েছে। শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠার দাবিতে তারা এখন আর জোর দিচ্ছে না। ১৯৭১ সালের ভূমিকার জন্য ক্ষমাও চেয়েছে। এমনকি স্থানীয় নির্বাচনে অমুসলিম প্রার্থীও মনোনয়ন দিয়েছে। তবে পুরনো মানসিকতার ছাপ রয়ে গেছে- বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, কোনো নারী দলটির নেতৃত্ব দিতে পারবেন না।
সবমিলিয়ে জামায়াতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কয়েকটি বড় প্রশ্নের ওপর: রাজনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতার ভূমিকা কী হবে এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মূল আদর্শ, যেমন তরুণদের অংশগ্রহণ, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙক্ষা- বাংলাদেশি সমাজে কতোটা প্রভাব ধরে রাখতে পারে।
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: সোমবার বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একটি বাণিজ্য চুক্তির ঘোষণা দেয়, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কহার ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে নেমেছে (গত বছর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ৩৭ শতাংশ শুল্ক ঘোষণা করেন)। যদিও কমানোটি প্রতীকী, তবু অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এটি একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও ফাইবার ব্যবহার করে তৈরি কিছু বাংলাদেশি পোশাক ও টেক্সটাইল রপ্তানিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা মিলবে। তৈরি পোশাক বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত। একইসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষিপণ্য, রাসায়নিক ও চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের জন্য বাজার উন্মুক্ত করবে।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত শ্রম অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে, যা ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ফাইন্যান্স করপোরেশন (ডিএফসি)-এর সম্ভাব্য বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। শ্রম অধিকার নিয়ে উদ্বেগের কারণে ডিএফসি এতদিন বাংলাদেশে বিনিয়োগে অনাগ্রহী ছিল। তবে কৃষি, জ্বালানি ও স্বাস্থ্য খাতে ডিএফসি’র বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য উপকারী হতে পারে।
মাইকেল কুগেলম্যানের মূল্যায়ন
বাংলাদেশে বহু বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন
মানবজমিন ডেস্ক
১৩ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার), ২০২৬
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
