১/১১ জমানার ভোট: বাড়তি ব্যালট ছাপার অভিযোগ, কাঠগড়ায় যারা

১/১১ জমানার ভোট: বাড়তি ব্যালট ছাপার অভিযোগ, কাঠগড়ায় যারা

ফন্ট সাইজ:

এক/এগারোর জমানায় হওয়া নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে শুরুতে মোটা দাগে প্রশ্ন উঠেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক ফ্যাসিবাদী শাসন ওই প্রশ্নকে অনেকটা চাপা দিয়েছিল। দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে মূলত ২০০৮ সালের ওই নির্বাচন ছিল বড় নিয়ামক। নানা কৌশলে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো এবং বিরোধী দল হিসেবেও বিএনপিকে ক্ষমতাহীন অবস্থায় রাখার পরিকল্পনা করেছিল সেনানিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ভূমিকায় ছিলেন তৎকালীন ডিজিএফআই ও সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা। যাদের কয়েকজন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর বাইরে তৎকালীন নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের একটি অংশ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছিল। সম্মিলিত এই পরিকল্পনার ফলে আওয়ামী লীগ তথাকথিত ভূমিধস জয় নিয়ে ক্ষমতায় আসে। ২৯টি আসন নিয়ে বিরোধী দলের সারিতে বসতে হয় বিএনপিকে। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদে বিতর্কিত ওই নির্বাচনের পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনছেন। যার অন্যতম ছিল অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো। ওই ব্যালট নির্ধারিত আসনে বণ্টন করা হয়েছিল। এই বাড়তি ব্যালট যোগ করেই নির্ধারিত ছকে নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হয়েছিল। যদিও নির্বাচনের আগে ডিজিএফআই, এনএসআই সহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জরিপে সেই সময়ে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া বিএনপি আসনের দিক থেকে এগিয়ে ছিল। প্রায় সব জরিপেই বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মতো আসনের তথ্য উঠে আসে। জরিপ তথ্য বিএনপিকে এগিয়ে রাখলেও সেই সময়ের সেনাপ্রধান মইন উ আহমেদ এবং অন্তর্বর্তী সরকার সংশ্লিষ্টরা বিএনপিকে ৩০টির মতো আসন দেয়ার পরিকল্পনা সাজান। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেয়া হয় বেশ কিছু কৌশল। আর এই কৌশলের বেশির ভাগ বাস্তবায়ন করে ড. এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশন। বিতর্কিত ওই নির্বাচন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠায় এটিএম শামসুল হুদা অনেকটা নিভৃতেই দীর্ঘ সময় কাটিয়ে প্রয়াত হয়েছেন। বাকি দুই কমিশনারের একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব শেষ করেছেন। অন্যজন ছহুল হোসাইন আওয়ামী লীগের আমলে হওয়া দু’টি নির্বাচনে দলটির প্রার্থী হওয়ার জন্য তৎপর ছিলেন। যদিও আওয়ামী লীগ তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয়নি। বলা হচ্ছে- এক/এগারোর সময়ে নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অংশ নেয়া কমিশনার সাখাওয়াত হোসেন সর্বশেষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারেও যুক্ত হয়েছিলেন। সম্প্রতি ওই নির্বাচনে বাড়তি ব্যালট ছাপানোর যে তথ্য সামনে আসছে তার দায় তৎকালীন কমিশনের জীবিত দুই কমিশনারের ওপর বর্তায়। এক/এগারোর দুই অন্যতম কুশীলব লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর রিমান্ডেও এ সংক্রান্ত তথ্য দিচ্ছেন বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে। সূত্রের দাবি, এক/এগারোর সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে শেখ হাসিনার সঙ্গে একটি গোপন চুক্তি করেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। চুক্তির আলোকে পাতানো নির্বাচনের মধ্যদিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়। এর বিনিময়ে বিভিন্ন অপকর্মের পরও আওয়ামী লীগ সরকার জেনারেল মাসুদ ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো পুরস্কৃত করে। চাকরি থেকে অবসরে গিয়ে সংসদ সদস্যও হয়েছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও সাংবাদিক আবু রূশদ সম্প্রতি এক লেখায় ২০০৮ সালের নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত লেখাটি আবু রূশদ নিজের ফেসবুক আইডিতেও শেয়ার করেন। ওই লেখায় ২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল কারিগর হিসেবে সাবেক ডিজিএফআই প্রধান ও তদানীন্তন এফএসআইবি ব্যুরোর পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শেখ মামুন খালেদ ও সিটিআইবি’র তদানীন্তন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এটিএম আমিনের নাম উল্লেখ করেন।

সেই সময়ে নিজের হাতে আসা গোপন জরিপ রিপোর্ট তথ্য উল্লেখ করে আবু রূশদ লিখেন, বিএনপি এককভাবে ১৫৫-১৬০ আসনে এগিয়ে ছিল, জোটভিত্তিক নির্বাচনে এই সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু একইসঙ্গে একটি ‘কঠোর নির্দেশনা’ দেয়া হয়েছিল- বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন দেয়া যাবে না। এই নির্দেশনা দেন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ। তিনি কোনোভাবেই বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে দেবেন না। এর সঙ্গে একটি প্রতিবেশী দেশের প্রভাবও জড়িত ছিল। এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য ‘নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং’ শুরু হয় এ টি এম আমিন ও শেখ মামুন খালেদের তত্ত্বাবধানে। নির্বাচনী ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়ায় কয়েকটি ধাপ ছিল। এর মধ্যে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো, গোপনে ব্যালট পরিবহন এবং ছক অনুযায়ী নির্বাচনী কর্মকর্তাদের একটি অংশকে প্রভাবিত করে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করা। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকের তথ্যে সেই সময়ের নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং এর স্পষ্ট ছক প্রকাশ পেয়েছে যা গ্রেপ্তার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এশিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক, স্বাধীন ও বেসরকারি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ জোট এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছিল, সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইনসম্মত হলেও রাজনৈতিক ফলাফল নিরপেক্ষ ছিল না। বহু আসনে দীর্ঘদিনের পরিচিত ভোটার কাঠামো ভেঙে পড়ে, স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যায় এবং ঐতিহ্যগত ‘সেফ সিট’ ধারণা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ধরন হঠাৎ বদলে যায়। রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়, এ পুনর্নির্ধারণ হয়েছে জরুরি অবস্থার সময় যখন রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক তৎপরতা সীমিত ছিল। ফলে আইনি আপত্তির সুযোগ থাকলেও বাস্তবে শক্ত রাজনৈতিক বিতর্ক বা প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।

ওই নির্বাচনের সময়ে দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন ও ছহুল হোসেনের সঙ্গে গতকাল টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এক-এগারোর সরকার যে বিএনপিকে ৩০টি বেশি আসন দেবে না- সেই পরিকল্পনা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও জানতে পেরেছিলেন। এটি জেনে তিনি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু বিএনপি’র জোটসঙ্গী জামায়াতের এক শীর্ষ নেতা বেগম জিয়াকে নির্বাচনের থাকার অনুরোধ করেন। তিনি এও বলেন, সব গোয়েন্দা তথ্যেই বিএনপি এবং তার মিত্ররা নির্বাচনে এগিয়ে আছে। তারাই নির্বাচনে জয়ী হবে। জামায়াতের ওই নেতাকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে আওয়ামী লীগ সরকার মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেয়। পরে তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো হয়। ২০০৮ সালের পাতানো নির্বাচনের অন্যতম কুশীলব তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের দুই সদস্য এখন নজরদারিতে রয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। যদিও এরপর আওয়ামী লীগের জমানায় ভোটার ছাড়া নির্বাচন আয়োজনের দুই কমিশন প্রধানই এখন কারাগারে রয়েছেন। সরকারের ছক অনুযায়ী ভোটার ছাড়া নির্বাচন বা দিনের ভোট রাতেই করার পরিকল্পনার অংশ হয়েছিল এই দুই কমিশন। ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের দায়িত্বে ছিল কে এম নুরুল হুদা কমিশন। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতার চেয়ারে তৃতীয়বার বসানোর জন্য রাতের ভোটের সিইসি হিসেবে তকমা লাগে তার নামের পাশে। বিতর্কিত ওই ভোট আয়োজনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর তাকে প্রথমে আটক করে ছাত্র-জনতা। আটকের পর তাকে লাঞ্ছিতও করা হয়। বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন। ওই কমিশনে আরও ছিলেন- সাবেক সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহাদাৎ হোসেন, প্রয়াত আমলা মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম এবং সাবেক জেলা জজ কবিতা খানম। ওই কমিশনে দায়িত্ব পালন করা মাহবুব তালুকদার একাই কমিশনের সব অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। ২০১৪ ও ২০১৮- টানা দুই সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের পর অনিয়মকে লাগাম টেনে ধরার ঘোষণা দিয়ে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি ইসির দায়িত্ব নেন প্রতিরক্ষা বিভাগের সাবেক সচিব কাজী হাবিবুল আউয়াল। তার অধীনে ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারির হওয়া ভোট তকমা পায় ‘ডামি নির্বাচন’ হিসেবে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ওই নির্বাচন আয়োজনের জন্য তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। সেই মামলায় বর্তমানে কাজী হাবিবুল আউয়াল কারাগারে রয়েছেন।

সামসুদিদন চৌধুরী কচি

৩ মাস আগে

জামাতে ইসলামি বাংলাদেশের একটা ভয়ানক নাম। এই মুজাহিদির জন‍্য বেগম জিয়ার এত কষ্ট করতে হয়েছেন। তারেক রহমান যেন ওদের থেকে দূরে থাকেন-এই অনুরোধ রইল।

Mohammad Harun Rashid

৩ মাস আগে

আবু রুশদ স্যার যে তথ্য দিয়েছেন তা সেনাবাহিনীর তৎকালীন প্রায় সব কর্মকর্তা জানতেন। এমনকি অনেক জেসিও এনসিও জানতেন। এই পরিকল্পনার সাথে তৎকালীন ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি জড়িত ছিলেন। আসলে বিএনপির বড় ধরণের পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল ১/১১'র কুশীলবদের সাথে বেগম খালেদা জিয়ার আপোষ করতে অনীহা প্রকাশ! এই সুযোগটি শেখ হাসিনা লুফে নেন! এতে একটি যুগান্তকারী ফলাফল এসেছে। শেখ হাসিনাকে অপমানজনক ভাবে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে, আর বেগম জিয়া সর্বোচ্চ সম্মান নিয়ে পরপারে চলে গেছেন।

GMA Zafar

৩ মাস আগে

২০০৮ সালের নির্বাচন যদি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতো তাহলে বাংলাদেশ ১৭টি বছর অন্ধকারে তলিয়ে যেতোনা। অতিরিক্ত ব্যলট ছাপানোর জন্য যারা দায়ী তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেওয়া হবে। ইনশা আল্লাহ। তাহলে ভবিষ্যতে কেউ নির্বাচন কমিশনের মতো পবিত্র সাংবিধানিক চেয়ারকে কলঙ্কিত করার চেষ্ঠা করবে না।

Mozammel Hoque

৩ মাস আগে

জামাত নিজের লাভের হিসাব আগে করে কারণ নির্বাচন হলে ওরা কূশি তাই বাঘের মত কারো পায়ে কামড়ে ধরে নির্বাচনে যায়। তবে কোন দিন জামাতের কোন লোকজনের বুদ্ধি নিবেন না। তাদের বুদ্ধি নিজের খতি করবে।এই দলটি একটা মিথ্যা বাদি দল।আমার কথা আপনি মিলিয়ে দেখেন

পুকুর উল্লা

৩ মাস আগে

সব কয়টি বিশ্ব বেহায়া

মন্তব্য করুন