যুদ্ধ বন্ধে কোনো শর্ত মানবে না ইরান

যুদ্ধ বন্ধে কোনো শর্ত মানবে না ইরান

ফন্ট সাইজ:

ইরান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, চলমান যুদ্ধ বন্ধ করার কোনো কৃত্রিম শর্ত তারা মেনে নেবে না এবং শান্তিচুক্তিতে বসতে হলে তেহরানের দেয়া শর্তই মেনে নিতে হবে। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেয়া যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, যুদ্ধ কবে এবং কীভাবে শেষ হবে তা কেবল তেহরানের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ বন্ধের যেকোনো সিদ্ধান্ত কেবল ইরানের নিজেদের শর্ত এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নেয়া হবে। এর আগে ইরানের এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা জানান, ওয়াশিংটনের দেয়া প্রস্তাবগুলো অবাস্তব। চলমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। এদিকে তেহরানকে যুদ্ধবিরতিতে রাজি করাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ট্রাম্প প্রশাসন। ক্রমাগত হুমকি ধামকি দিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছেন, আগামী কয়েকটা দিন ইরানের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যদি যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হয় তাহলে যুদ্ধ আরও তীব্র হবে। এই সতর্কবার্তার আগে গতকাল দুবাই উপকূলে থাকা কুয়েতের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালায় ইরান। এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালি নিয়ে সুর পাল্টেছেন। বলেছেন, হরমুজ প্রণালির বিষয়টি অমীমাংসিত রেখেই তিনি যুদ্ধবিরতিতে যেতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া ফ্রান্স এবং বৃটেনসহ যেসব দেশ এই যুদ্ধে সহায়তা করেনি তাদের সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। বলেছেন, প্রণালিটি উদ্ধার করে নিজেদের তেল সংগ্রহ করার জন্য তাদের লড়াই করা উচিত। গতকালও তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা গেছে। ওয়াশিংটনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে হেগসেথ জানান, ট্রাম্প একটি চুক্তি করতে আগ্রহী এবং আলোচনা চলছে যা ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হচ্ছে। তবে ইরান যদি শর্ত না মানে তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। হেগসেথ বলেন, আমাদের সামনে বিকল্প বাড়ছে, আর তাদের বিকল্প কমছে। মাত্র এক মাসেই আমরা শর্তগুলো নির্ধারণ করে দিয়েছি, আসন্ন দিনগুলো হবে চূড়ান্ত। ইরান তা জানে এবং সামরিকভাবে তাদের কিছুই করার নেই।

ইরানের প্রেসিডেন্টের কঠোর হুঁশিয়ারি: মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ বন্ধের যেকোনো সিদ্ধান্ত কেবল ইরানের নিজেদের শর্ত এবং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই নেয়া হবে। তেহরানে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার এক বিশেষ বৈঠকে তিনি একথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হবে ইরানের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং মহান ইরানি জাতির স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে নিরবচ্ছিন্ন জনসেবা নিশ্চিত করায় সব খাতের প্রশংসা করেন। তবে তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জায়নিস্ট শাসনামলের (ইসরাইল) এই আগ্রাসনের মুখে জাতীয় সক্ষমতা টিকিয়ে রাখার প্রধান স্তম্ভ হলো সমন্বিত জনসেবা। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই ধারা বজায় রাখতে হবে। দেশ রক্ষায় ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করে পেজেশকিয়ান বলেন, তাদের এই প্রতিরোধ জাতির গর্বের ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায় হয়ে থাকবে। আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষায় সশস্ত্রবাহিনীর ভূমিকাকে তিনি ‘নির্ণায়ক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে অভিহিত করেন।

তেলের দামে আগুন: মাসব্যাপী এই সংঘাতের ফলে জ্বালানি সরবরাহ চরমভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়ার হুমকি তৈরি হয়েছে। ট্যাংকারে হামলার পর অপরিশোধিত তেলের দাম আবারো সাময়িকভাবে লাফিয়ে বেড়েছে। ওই ট্যাংকারটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করতে সক্ষম, বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী যার দাম ২০ কোটি ডলারেরও বেশি। হামলার ঘটনা কমার কোনো লক্ষণ না থাকায় পাকিস্তান এই যুদ্ধে মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনার পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার মঙ্গলবার চীন সফরে এই সংঘাত নিয়ে আলোচনা করার কথা ছিল। ইরানের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং তাদের তেলের বৃহত্তম ক্রেতা মঙ্গলবার সব পক্ষকে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন। শান্তিচুক্তি স্থাপনে ব্যর্থতা ইউরোপীয় ইউনিয়নের জ্বালানি প্রধানকে সদস্য দেশগুলোকে জ্বালানি বাজারে একটি দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন বা সংকটের জন্য প্রস্তুত থাকার সতর্কতা দিতে বাধ্য করেছে। তেল ও জ্বালানির উচ্চমূল্য মার্কিন পরিবারগুলোর ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা পর্যায়ে গ্যাসোলিনের গড় দাম গত তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালন ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বৈশ্বিক সরবরাহের ঘাটতির কারণে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১১৪ ডলারের উপরে উঠে গেছে, যা মাসিকভিত্তিতে রেকর্ড বৃদ্ধির পথে রয়েছে।

নতুন হামলা: গতকাল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্যবস্তুতে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে ইরান। দেশটির একজন সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, তাদের একটি হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল মার্কিন সামরিক বাহিনীর লুকানোর পাঁচটি ইসরাইলি ঘাঁটি। মঙ্গলবার দুবাই জুড়ে বিস্ফোরণের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয় এবং সৌদি আরবের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, খরাজ প্রদেশে একটি ড্রোন আটকানোর পর সেটির ধ্বংসাবশেষ পড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তেহরানেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং পূর্ব পিরুজি জেলার বাসিন্দারা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জানজানে শিয়া মুসলমানদের একটি মজলিস বা শোকসভায় হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন বলে এক প্রাদেশিক কর্মকর্তা ইরানি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী মঙ্গলবার জানিয়েছে, তারা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গতরাতে তেহরানে বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় একটি ব্যালেস্টিক মিসাইল ওয়ারহেড কারখানা, অস্ত্র গবেষণা কেন্দ্র এবং মিসাইল উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করার দাবি করেছে তারা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সৈন্যের আগমন: বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দুইজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন সেনাবাহিনীর অভিজাত ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের কয়েক হাজার সৈন্যের বহর মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছে। এটি অতিরিক্ত শক্তি সঞ্চয়ের একটি অংশ। যা ট্রাম্পের সামনে ইরানে স্থল অভিযানের মতো সম্ভাব্য বিকল্পগুলো উন্মুক্ত করবে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ট্রাম্প আগামী ৬ই এপ্রিলের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চান, যাতে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়।