ইরানের ইসফাহানে ৯০০ কেজির বাঙ্কার বাস্টার বোমা নিক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই বিস্ফোরণের একটি ভিডিও শেয়ার করেছেন মঙ্গলবার ভোরে। ভিডিওতে একাধিক বিস্ফোরণ দেখা যায়। এরপর রাতের আকাশ কমলা আগুনের শিখায় আলোকিত হয়ে ওঠে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। ট্রাম্প ভিডিওটির কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলার দৃশ্য। ইসফাহানের একটি বড় গোলাবারুদ ডিপো লক্ষ্য করে এ হামলা করা হয়েছে। প্রায় ২৩ লাখ মানুষের শহর ইসফাহানে বদর সামরিক বিমানঘাঁটি অবস্থিত। এনডিটিভি নিরপেক্ষভাবে ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে উদ্ধৃত এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ইসফাহানের ওই ডিপোতে প্রায় ৯০৭ কেজি ওজনের ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই হামলায় বিপুল পরিমাণ বাঙ্কার বাস্টার বা ভূপৃষ্ঠ ভেদকারী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। হামলার ফলে ধারাবাহিক শক্তিশালী দ্বিতীয় দফার বিস্ফোরণ ঘটে, যা বিশাল অগ্নিগোলক ও শকওয়েভ সৃষ্টি করে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে এই হামলা সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। একই সময়ে পাকিস্তান, মিশর, সৌদি আরব ও তুরস্ক কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চালাচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভেট জানিয়েছেন, আগামী ৬ই এপ্রিলের মধ্যে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি চাইছেন ট্রাম্প।
ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেওয়ার আশঙ্কা
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান প্রায় ৫৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইসফাহানের একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সরিয়ে থাকতে পারে। গত বছর গ্রীষ্মে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ অভিযানের সময়ও শহরটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো টার্গেট করা হয়েছিল। মঙ্গলবার হামলার খবর আসে এমন এক সময়, যখন ডনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ইরানকে দ্রুত সমঝোতায় এসে চুক্তি করার চাপ দেন। যদি ইরান তাতে রাজি না হয় তাহলে তাদের জ্বালানি স্থাপনা, পারমাণবিক কেন্দ্র এবং পানি সরবরাহ ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের হুমকি দেন। তিনি বলেন, আরও যুক্তিসঙ্গত নতুন শাসনের সঙ্গে আলোচনা ফলপ্রসূ না হলে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু না করলে যুক্তরাষ্ট্র এসব স্থাপনা ধ্বংস করবে।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে বিতর্ক
ডনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার দাবি করেছেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। তবে জাতিসংঘের পারমাণবিক তদারকি সংস্থা এই দাবিকে সমর্থন করেনি। অথচ ট্রাম্প দাবি করেন, গত বছরের হামলায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করেছেন।
‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা কী
‘বাঙ্কার বাস্টার’ হলো এমন ধরনের বোমা, যাতে শক্ত স্টিলের আবরণ থাকে। এটি মাটি ও কংক্রিট ভেদ করে নির্দিষ্ট গভীরতায় পৌঁছে বিস্ফোরিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিসের অস্ত্র বিশেষজ্ঞ রায়ান ব্রোবস্ট এনপিআর’কে বলেন, এসব বোমায় বিস্ফোরক উপাদান তুলনামূলক কম হতে পারে। কিন্তু এর শক্ত আবরণ এটিকে মাটির ভেতরে ড্রিলের মতো ঢুকতে সাহায্য করে এবং তারপর লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে।
কিছু বাঙ্কার বাস্টারে ‘হার্ড টার্গেট স্মার্ট ফিউজ’ (এইচটিএসএফ) ব্যবহার করা হয়, যা কতগুলো স্তর ভেদ করা হয়েছে বা ঘনত্বের পরিবর্তন বুঝে নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে বিস্ফোরিত হয়, যেমন ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো।
কিছু বোমায় মাইক্রোফোনও থাকে, যাতে ভেতরে শব্দ শনাক্ত করে বিস্ফোরণ ঘটানো যায়। এই বোমার বিপজ্জনক দিক শুধু বিস্ফোরণের শক্তি নয়, বরং এটি এমন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে, যা অন্য বোমা দিয়ে সম্ভব নয়। ‘বাঙ্কার বাস্টার’ নতুন অস্ত্র নয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকেই এর ব্যবহার শুরু। উদাহরণ হিসেবে ব্লু-১০৯ বোমা ১৯৮৫ সালে ব্যবহারে আসে। তবে আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো পাহাড়ি ও গুহাময় এলাকায় যুদ্ধের সময় এ ধরনের নির্ভুল অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।
