ইসলামাবাদে রবিবার মিশর, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শুধু ইরানে যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনাকেই জোরদার করেনি, বরং যুদ্ধপরবর্তী সময়ে ইসরাইল ও ইরানের প্রভাব সীমিত করতে একটি নতুন ব্যবস্থার সূচনাও করেছে। চারটি দেশ এর আগেও একসঙ্গে বৈঠক করেছে। তবে রবিবারের একদিনের এই বৈঠকটি এক অর্থে এমন একটি উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক সূচনা, যা কূটনীতিকদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করেছে।
ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা বিরোধের মধ্যে এই জোটের প্রথম লক্ষ্য হলো সব পক্ষকে সংঘাত বৃদ্ধি বন্ধ করতে রাজি করানো এবং একটি যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছানো। এ কারণে ভবিষ্যতে এই দেশগুলো আরও ঘন ঘন বৈঠক করবে বলে জানিয়েছেন ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উপসাগরীয় বিশেষজ্ঞ ইয়াসমিন ফারুক। তিনি বলেন, এই চার দেশের জোট খুব সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কারণ যুদ্ধ এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমরা ইতিমধ্যে দেখেছি ইসরাইল ইরানের ভেতরে পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত করেছে এবং সেনা মোতায়েনের আশঙ্কাও রয়েছে। এটি এক ভয়াবহ পরিস্থিতি। যা উপসাগরীয় কিছু দেশকে, যারা এতদিন বলছিল যুদ্ধ থামানোর প্রয়োজন নেই, তারা বুঝতে বাধ্য করতে পারে যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। কারণ যদি পানি লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো লক্ষ্যবস্তু হয়, অথবা উপসাগরের পানিতে পারমাণবিক বিগলন হয়ে তেজষ্ক্রিয়তা ঘটে, তাহলে সেটি ওই দেশগুলোর ভেতরে জাতীয় সংকটে পরিণত হবে।
রবিবারের ইসলামাবাদ বৈঠকে কিছু অগ্রগতি হয়েছে। বৈঠক শেষে ইরান সম্মত হয়েছে যে, পাকিস্তানের পতাকাবাহী জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে, সম্ভবত দিনে দুটি করে। এটি একটি ছোট কিন্তু আস্থা তৈরির পদক্ষেপ। এছাড়া সিদ্ধান্ত হয়েছে, এই জোট ইরানের সঙ্গে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করবে। ফলে তেহরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার পথ খোলা থাকবে। ইরান বলছে, এটিই একমাত্র নির্ভরযোগ্য যোগাযোগের পথ এবং ডনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি আলোচনার দাবি আসলে তেলের দাম কমানোর জন্য তৈরি করা একটি কৌশল।
রবিবারের বৈঠকের পরপরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীন সফরে যান বেইজিংকে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করতে। যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তির গ্যারান্টর হিসেবে চীনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করবে না এমন ধারণাও ইরানের ভেতর থেকে এসেছে।
প্রাথমিক দৃষ্টিতে এই চার দেশের জোট কিছুটা অপ্রত্যাশিত মনে হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সৌদি আরব প্রায়ই সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গোপনে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে উৎসাহিত করতে দেখা গেছে। সেই দেশটিও এই জোটের সক্রিয় সদস্য। এটি অন্তত এই ইঙ্গিত দেয় যে সৌদিরা তাদের সব বিকল্প খোলা রাখছে। ফারুক বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য সব বিকল্পই ব্যয়বহুল। তারা চায় ইরান তাদের ওপর হামলার জন্য মূল্য দিক এবং হরমুজ প্রণালিকে জিম্মি করারও শাস্তি পাক। অন্যদিকে তারা নিশ্চিত নয় যুক্তরাষ্ট্র বিশৃঙ্খলা তৈরি না করে এবং তারপর সরে না গিয়ে এই সংঘাতের শেষ টানতে পারবে কি না, যা সৌদি আরব দেখতে চায় না।
তুরস্কের ঘনিষ্ঠ মিত্র কাতার ইসলামাবাদের এই বৈঠকে উপস্থিত ছিল না। একটি ব্যাখ্যা হলো কাতার এখনো ক্ষুব্ধ। কারণ তাদের মতে ইরান রাস লাফান তরল গ্যাস স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যদিও সেটি আগে থেকেই বন্ধ ছিল। এক বিশ্লেষক বলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপরীতে গিয়ে যুদ্ধের অবসান চায় দোহা। তবে ইরানের পক্ষ হয়ে সক্রিয় মধ্যস্থতাকারী হওয়ার মানসিকতায় নেই তারা।
এই জোটের সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সদস্য এবং এর সফলতায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করেছে তুরস্ক। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে বলছে, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও তাদের সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো নিয়ে আলোচনা পুরো অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে হওয়া উচিত, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে নয়। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি মূলত দ্বিপাক্ষিকভাবে আলোচিত হতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এই বিভাজনের বিরোধিতা করে। সপ্তাহান্তে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিন উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুদ্ধের বিস্তৃত প্রেক্ষাপট বিবেচনা করতে এবং ইসরাইলকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারে- এমন ফলাফলের ঝুঁকি বুঝতে আহ্বান জানান।
কালিন বলেন, এই যুদ্ধের লক্ষ্য শুধু ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা নয়, বরং আরও বিপজ্জনক কিছু। এ অঞ্চলের প্রধান জাতিগোষ্ঠী যেমন তুর্কি, কুর্দি, আরব ও পারসিকদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করা। এটি দীর্ঘমেয়াদি গৃহযুদ্ধ ও রক্তক্ষয়ী দ্বন্দ্বের পথ খুলে দেবে। তিনি আরও বলেন, আমরা খুব ভালো করেই জানি, যারা এই যুদ্ধ শুরু করেছে তারা লেবানন, সিরিয়া, ফিলিস্তিনি অঞ্চল এবং অন্যত্র ধ্বংস, সংযুক্তিকরণ ও দখলনীতির মাধ্যমে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে চাইছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ইরানের হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে আমরা যেন কখনো ভুলে না যাই- এই যুদ্ধ কে শুরু করেছে।
শুক্রবার এ হাবার টিভিকে দেয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে হাকান ফিদান বলেন, ইসরাইলের লক্ষ্য হলো মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা, যাতে তারা ইরানবিরোধী জোটকে আরও বিস্তৃত করতে পারে। তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে, অঞ্চলটি ধাপে ধাপে ইসরাইলের পরিকল্পিত খেলায় জড়িয়ে পড়ছে। উপসাগরীয় দেশগুলো যেন ইসরাইলের এই খেলায় পা না দেয়। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের জনমত এখন যুদ্ধের বিরুদ্ধে চলে যাচ্ছে এবং ডনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির একটি কাঠামোগত সমস্যা হলো ইসরাইলের ওপর চাপ প্রয়োগের কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই।
তিনি আরও বলেন, যদি আমেরিকা ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়, তাহলে তাকে ইসরাইলের ওপর অত্যন্ত শক্তিশালী প্রভাব প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। দেখা যাবে, এখানে শেষ পর্যন্ত কার প্রভাব বেশি- কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কতটা।
(লেখক গার্ডিয়ানের ডিপ্লোম্যাটিক এডিটর)
