ওয়াশিংটন ও তেহরান শিগগিরই শান্তি আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। এমন দাবি করেছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। তিনি রবিবার টেলিভিশনে দেয়া ব্রিফিংয়ে বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শিগগিরই শান্তি আলোচনা করতে সম্মত হওয়ায় ইসলামাবাদ এতে খুশি। তিনি বলেন, এগুলো হবে অর্থবহ আলোচনা। এর ফলে সামগ্রিক সমাধানের দিকে এগোবে চলমান যুদ্ধ নিয়ে উত্তেজনা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট।
তুরস্ক, মিশর এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে বহুপাক্ষিক বৈঠকের পর এ মন্তব্য করেন তিনি। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলো চেষ্টা চালাচ্ছে। ইসহাক দার বলেন, পাকিস্তান খুবই খুশি যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ই পাকিস্তানের ওপর আস্থা রেখে আলোচনায় সহায়তার জন্য সম্মতি দিয়েছে। তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি প্রশমিত করা এবং সংঘাতের সমাধান খুঁজে বের করতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সঙ্গেও যুক্ত আছি। তবে এ পর্যন্ত ওয়াশিংটন বা তেহরান কেউই পাকিস্তানের সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে নিশ্চিত করেনি।
পাকিস্তান নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতে শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এর পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উন্নত সম্পর্ক এবং ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব। তবে এই ভূমিকায় পাকিস্তানের আবির্ভাব অনেককেই বিস্মিত করেছে। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটিকে অনেক সময় অস্থিতিশীল ও অনির্ভরযোগ্য হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে আছে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তি। সেই চুক্তির অধীনে এক দেশ আক্রান্ত হলে তা অন্য দেশের ওপর আঘাত হিসেবে গণ্য করার কথা। কিন্তু এরই মধ্যে সৌদি আরবে একাধিকবার হামলা করেছে ইরান। কিন্তু পাকিস্তান সেক্ষেত্রে জবাব দেয়া থেকে বিরত থেকেছে।
চ্যাথাম হাউসের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র গবেষক চিয়েতিগজ বাজপায়ী দ্য ইন্ডিপেনডেন্টকে বলেন, পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতার চেষ্টা উচ্চাকাক্সক্ষী হলেও এতে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তিনি বলেন, এখানে অনেক অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। চ্যালেঞ্জ হলো পাকিস্তানের এই উচ্চাকাক্সক্ষা যেন সেই দ্বন্দ্বের ভারে ভেঙে না পড়ে, অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক উভয় ক্ষেত্রেই। তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিকভাবে পাকিস্তান আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে আছে। একদিকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করতে চাইছে, অন্যদিকে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনায় মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিচ্ছে ইরান। এটা এক ধরনের বিদ্রƒপ। এছাড়া গত বছরের চার দিনের সংঘাতের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও খারাপ অবস্থায় রয়েছে।
বাজপায়ী আরও বলেন, পাকিস্তানের কূটনৈতিক অবস্থানকে জটিল করে তুলেছে এই বিষয়টি যে দেশটির সঙ্গে ইসরাইলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। অথচ এই সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ ইসরাইল। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে পাকিস্তান। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে, যা তার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তিনি বলেন, একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানকে দেখা কঠিন। ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও সবসময় মসৃণ ছিল না। কারণ, ২০২৪ সালে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী ইস্যুতে সীমান্তে সংঘর্ষ হয়।
আরেক বিশ্লেষক এটিকে পাকিস্তানের কূটনৈতিক পুনরুত্থান হিসেবে দেখছেন। একসময় আল কায়েদার সাবেক প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল পাকিস্তান। তাদের সামরিক সহায়তা স্থগিত করে যুক্তরাষ্ট্র। ডনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে পাকিস্তানকে ‘মিথ্যা ও প্রতারণা ছাড়া কিছু দেয়নি’ বলে আখ্যা দেন। মিডল ইস্ট পলিসি কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো কামরান বুখারি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হওয়া ইসলামাবাদের কৌশলগত অবস্থানের বড় উন্নতি। দীর্ঘদিন সমস্যাগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত থাকার পর পাকিস্তান আবার পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় ধরনের মধ্যস্থতার অভিজ্ঞতা না থাকলেও পাকিস্তানের ‘অস্বাভাবিক বিশ্বাসযোগ্যতা’ রয়েছে। কারণ তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুই পক্ষেরই কার্যকর সম্পর্ক আছে। পাকিস্তান ইরানের প্রতিবেশী দেশ হিসেবে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখে এবং তাদের মধ্যে একটি সংবেদনশীল সীমান্ত রয়েছে বেলুচিস্তান অঞ্চলে। সেখানে দুই পাশেই বিদ্রোহী কার্যক্রম চলে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সীমান্তে সংঘর্ষ হলেও দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।
অন্যদিকে, কাতার বা ওমানের মতো দেশগুলোর বিপরীতে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটি নেই। ফলে ইরানের হামলার ঝুঁকিও তুলনামূলক কম। ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পাকিস্তান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ধীরে ধীরে ট্রাম্পের আস্থা অর্জন করেছেন। শেহবাজ শরিফ ছিলেন প্রথম দিকের বিশ্বনেতাদের একজন, যিনি ট্রাম্পের ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব পিস-এ যোগ দেন। তিনি এর আগে ভারত-পাকিস্তান চার দিনের যুদ্ধের অবসানে ট্রাম্পের মধ্যস্থতাকে প্রশংসা করেন, যদিও ভারত তা অস্বীকার করে।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনিরও ট্রাম্পের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন। তাকে ট্রাম্প তার ‘প্রিয় পাকিস্তানি ফিল্ড মার্শাল’ বলেছেন। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের অ্যাডাম ওয়েইনস্টেইন বলেন, পাকিস্তানের একটি বিশেষ ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক আছে। আবার উভয়ের সঙ্গে অতীতে টানাপোড়েনও ছিল, যা তাকে একটি গ্রহণযোগ্য মধ্যস্থতাকারী করে তোলে।
ভারতে অবশ্য পাকিস্তানের এই ভূমিকা নিয়ে অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। বিরোধীরা বলছে, এটি ভারতের কূটনৈতিক ব্যর্থতা এবং পাকিস্তানের সক্রিয়তা দিল্লির প্রভাব কমে যাওয়ার ইঙ্গিত। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এক বৈঠকে বলেন, ভারত ‘পাকিস্তানের মতো দালাল রাষ্ট্র নয়’, ইঙ্গিত করে যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ভারতের জন্য মর্যাদাহানিকর। বাজপায়ী বলেন, বাস্তবে ভারতই ভালো মধ্যস্থতাকারী হতে পারত। কারণ তার যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
ডনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে ‘সরাসরি ও পরোক্ষভাবে’ আলোচনা করছে, যদিও তেহরান তা অস্বীকার করেছে। তিনি বলেন, আমরা খুব ভালো করছি। কিন্তু ইরানের সঙ্গে কখন কী হয় বলা যায় না। আমরা আলোচনা করি, তারপর আবার তাদের ওপর হামলা চালাতে হয়।
ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ পাকিস্তানে আলোচনার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়ে বলেন, এটি আসলে এ অঞ্চলে আরও মার্কিন সেনা মোতায়েনের একটি সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ইরানি বাহিনী মার্কিন সেনাদের আসার অপেক্ষায় আছে। তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে শাস্তি দেবে।
এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে গভীর বিভাজন কমানো। বাজপায়ী সতর্ক করে বলেন, এটি উল্টো ফল দিতে পারে। তিনি বলেন, এখানে ঝুঁকি অনেক, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সীমিত। তিনি আরও বলেন, এ পর্যন্ত ইরান অনেক দেশে টার্গেট করেছে, কিন্তু পাকিস্তানকে নয়। সম্ভবত পাকিস্তানে মার্কিন ঘাঁটি না থাকার কারণে। তবে যদি পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের খুব ঘনিষ্ঠ মনে হয়, তাহলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা চুক্তিও তার নিরপেক্ষতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এদিকে তেহরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, উপসাগর থেকে সামরিক ঘাঁটি সরাতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন নিরাপত্তা কাঠামোয় সম্মত হতে হবে।
