পাকিস্তানের দাবি ইরান তাদের পতাকাবাহী ২০টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। এ বিষয়ে ইরানের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছে। ইসলামাবাদ একে আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ জ্বালানি সংকট নিরসনের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার শনিবার এক্সে এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এই চুক্তির আওতায় প্রতিদিন দুটি করে জাহাজ পারাপার হবে। তিনি ইরানের এই সিদ্ধান্তকে ‘শান্তির বার্তা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, এটি উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে এটা। তিনি একে ‘স্বাগত ও গঠনমূলক পদক্ষেপ’ হিসেবেও অভিহিত করেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।
উল্লেখ্য তিনি তার পোস্টে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন। এতে বোঝা যায়, যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যুক্ত ইসলামাবাদ এই চুক্তিকে কেবল দ্বিপাক্ষিক শিপিং চুক্তি হিসেবে দেখছে না। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে আছে। ওই হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন এবং যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে প্রায় ২,০০০ ইরানি এবং লেবাননে ১১ শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। এতে বৈশ্বিক বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
কাতারের সাবেক মন্ত্রী মোহাম্মদ আল-হাশেমি আল জাজিরায় এক কলামে লিখেছেন, হরমুজ প্রণালি শুধু তেলের পথ নয়, এটি বৈশ্বিক উৎপাদনের মূল ধমনী। এটি বন্ধ হলে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে।
এই সংকীর্ণ জলপথের দুই পাশে প্রায় ২,০০০ জাহাজ আটকে আছে। ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ওদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এই প্রণালিকে কার্যত একটি চেকপোস্টে পরিণত করেছে। যেসব জাহাজ চলাচল করতে চায়, তাদের পণ্যের তথ্য, ক্রু তালিকা ও গন্তব্য জমা দিতে হয়। অনুমোদন কোড নিতে হয় এবং ইরানের জলসীমা দিয়ে নিরাপত্তা পাহারায় যেতে হয়। প্রতিটি পারাপারের জন্য প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এই ফি চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পরিশোধ করা হয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট এখন এই ব্যবস্থা বৈধ করার উদ্যোগ নিচ্ছে, যাতে এটি নিয়মিত আয়ের উৎস হয়।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম শুক্রবার জানান, মালয়েশিয়ার জাহাজগুলোকেও পারাপারের অনুমতি দেয়া হয়েছে এবং তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানকে ধন্যবাদ জানান। যুদ্ধ শুরুর পর এ পর্যন্ত মাত্র প্রায় ১৫০টি জাহাজ এই পথ অতিক্রম করতে পেরেছে। যা স্বাভাবিক দিনের তুলনায় অনেক কম। মোট সামুদ্রিক চলাচল প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য গত ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
শনিবারের ঘোষণা পাকিস্তানের তীব্র কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফল। সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির রবিবার ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন। ইসহাক দার ইরান ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, সব পক্ষ চাইলে ইসলামাবাদ আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত। ওদিকে ডনাল্ড ট্রাম্প মিয়ামিতে এক বিনিয়োগ সম্মেলনে হরমুজ প্রণালিকে ভুল করে ‘স্ট্রেইট অব ট্রাম্প’ বলে ফেলেন, পরে তা সংশোধন করেন।
ইরান যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবে এই প্রণালির ওপর তাদের কর্তৃত্ব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের পার্লামেন্ট স্থায়ীভাবে টোল আদায়ের আইন প্রণয়নের কাজ করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রী সুলতান আল জাবের এই পরিস্থিতিকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এর প্রভাব গ্যাসের দাম, বাজার এবং ওষুধের ওপর পড়ে। সব দেশই এর খেসারত দেয়।
