গত সপ্তাহে যখন ইরানে যুদ্ধ তীব্র হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি অবকাঠামোর জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছিল, তখন পাকিস্তান কঠোর চেষ্টা করেছে নিজেকে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে ব্যাক-চ্যানেলের যোগাযোগের মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রমাণ করার জন্য। কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছিল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরের সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে রবিবার ফোন করার মাধ্যমে।
পরের দিন প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেন। এমনকি ইসলামাবাদকে সম্ভাব্য আলোচনার স্থান হিসেবে প্রস্তাব দেন। এরপর ইরানকে ১৫ দফার একটি মার্কিন শান্তি পরিকল্পনা পাঠায় পাকিস্তান, যা তেহরান প্রত্যাখ্যান করে। পাকিস্তান, তুরস্ক, এবং মিশর কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে ব্যাক-চ্যানেলে কূটনীতি চালাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হওয়ায় এবং বৈশ্বিক শক্তি সংকট দেখা দেয়ায় তাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা বাড়ে।
কিন্তু পাকিস্তানের জন্য শান্তির পথ সহজ হবে না, বিশেষত যদি ইরান পিছু না হটে। যে কোনো উত্তেজনা ইসলামাবাদকে সরাসরি সংঘাতে টেনে নিতে পারে, বিশেষত সৌদি আরবের সঙ্গে তার প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে। যদি ইসলামাবাদ সফলভাবে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের কর্মকর্তাদের এক ছাদের নিচে আনতে পারে, তবে পাকিস্তানের বৈশ্বিক মর্যাদা এমন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে যা ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের চীনে গোপন কূটনৈতিক মধ্যস্থতা করার সময়ের পর থেকে দেখা যায়নি। এটি ট্রাম্পের সঙ্গে এক বছরের সম্পর্ক নির্মাণের চূড়ান্ত ফলাফলও হবে, যা কূটনীতি ও ক্রিপ্টো ডিলের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।
যেখানে ইসলামাবাদ এই সময়ে সরাসরি ওয়াশিংটন এবং তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, সেখানে যুদ্ধের সমাপ্তি পাকিস্তানের জন্য সরাসরি উপকারী হবে। পাকিস্তানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিয়া মুসলিম জনসংখ্যার দেশ। প্রথম অবস্থানে আছে ইরান। ইরানে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পাকিস্তানে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ইসলামাবাদের সবচেয়ে বড় আশঙ্কার মধ্যে একটি, বিশেষত যেহেতু পাকিস্তান ইতিমধ্যেই আফগান তালেবানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত এবং ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহের বিঘ্নও সহ্য করেছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের মিডল ইস্ট প্রোগ্রামের উপ-পরিচালক আদম ওয়েইনস্টাইন বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতা করার অস্বাভাবিক বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে।
কারণ এটি ওয়াশিংটন এবং তেহরানের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখে। গত এক বছরে পাকিস্তানের শক্তিধর সেনাপ্রধান অসিম মুনির ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন অবিশ্বাস মেরামত করার জন্য। অসিম মুনির জানুয়ারিতে ট্রাম্পের সঙ্গে ডাভোসে সাক্ষাৎ করার পরে পাকিস্তান ট্রাম্পের বোর্ড অফ পিসে যোগ দেয়। ইসলামাবাদ ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ক্রিপ্টো ব্যবসার সঙ্গে চুক্তি করেছে। হোয়াইট হাউসের দূত স্টিভ উইটকফ নিউ ইয়র্কের রুজভেল্ট হোটেল পুনর্নির্মাণ চুক্তি মধ্যস্থতা করেছেন। ওই হোটেলটি পাকিস্তানের জাতীয় বিমান সংস্থার মালিকানাধীন।
ইরান সংঘাত শেষ করার কূটনীতি পাকিস্তান শুরু থেকেই পরিচালনা করছে, যার মধ্যে অন্তত ছয়টি বার্তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থানান্তর করা হয়েছে। ইসলামাবাদ ইসরাইলকেও প্রভাবিত করেছে যাতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফকে হত্যার তালিকা থেকে বাদ রাখা হয়েছে। পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে সংবেদনশীল সীমান্ত শেয়ার করে, বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমের বেলুচিস্তান প্রদেশে। ওই অঞ্চলে দশকেরও বেশি সময় ধরে বিদ্রোহ চললে। প্রতিবেশীরা জানুয়ারি ২০২৪-এ সীমান্তে সংঘর্ষে জড়ায়। তবে সম্পর্ক পরবর্তীতে মেরামত হয়। ইরান পাকিস্তানকে অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর তুলনায় বেশি নিরপেক্ষ মনে করতে পারে। য়েইনস্টাইন বলেন, কাতারের মতো উপসাগরীয় রাষ্ট্রের মতো নয়, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিকে আশ্রয় দেয়নি। তাছাড়া পাকিস্তান নিজেই একটি সামরিক শক্তি।
সৌদি সমস্যা
তবে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান তার অবস্থান কঠোর করেছে। ভবিষ্যতের সামরিক কার্যক্রম থেকে নিশ্চয়তা, ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ দাবি করেছে তারা। তেহরান যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আঘাতের প্রতিশোধে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আঘাত করে, ইসলামাবাদের সঙ্গে রিয়াদের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা সেপ্টেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত হয়েছে সেটা সমস্যার কারণ হতে পারে। এই চুক্তি উভয় দেশকে অন্যকে সাহায্য করার বাধ্যবাধকতা দেয় এবং তাই হিসাব-নিকাশে প্রভাব ফেলে।
যখন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করে এবং তেহরান সৌদি আরবকে আঘাত করে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন যে তিনি চুক্তি সম্পর্কে ইরানকে স্মরণ করিয়েছেন এবং মধ্যস্থতার চেষ্টা করছেন। পাকিস্তানের নিরাপত্তা সূত্রগুলো রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, ইসলামাবাদ চুক্তির ফলে বাধ্য হলেও, তারা ইরানের সঙ্গে ব্যাকচ্যানেল আলোচনার মাধ্যমে সংঘাতে প্রবেশ এড়ানোর চেষ্টা করছে।

EKRAM
২ মাস আগেআলোচনার আলোচনা চলবে -আবার হামলা'ও চলতে থাকবে !!! তাহলে সমঝোতা হবে কিভাবে?