ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশল এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের আক্রমণাত্মক বক্তব্যের শিকড় খুঁজতে হলে ইতিহাসে প্রায় এক শতাব্দী পেছনে যেতে হয়। ১৯২১ সালে ইতালীয় জেনারেল জুলিও দুএ ‘দ্য কমান্ড অব দ্য এয়ার’ গ্রন্থে যুদ্ধের এক নতুন ধারণা দেন। স্থলযুদ্ধ নয়, ব্যাপক আকাশ হামলাই হবে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের নির্ণায়ক শক্তি।
দুএর মতে, শুধু সামরিক লক্ষ্য নয়, বেসামরিক অবকাঠামো ও জনসাধারণকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালালে শত্রু রাষ্ট্রের মনোবল ভেঙে পড়বে এবং জনগণ নিজেরাই যুদ্ধ বন্ধের দাবি তুলবে। এই ধারণা পরবর্তীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি জার্মানির বিমান হামলা, লন্ডন ব্লিটজ কিংবা জাপানে যুক্তরাষ্ট্রের অগ্নিবোমা ও পারমাণবিক হামলার মতো অভিযানে প্রতিফলিত হয়।
বর্তমান মার্কিন কৌশলেও সেই চিন্তার প্রতিফলন দেখা যায় বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ইরানে চলমান বিমান অভিযানে হেগসেথ ‘ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও নির্ভুল আকাশ অভিযান’ চালানোর দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, এটি নতুন কিছু নয়, বরং পুরনো ধারণার পুনরাবৃত্তি।
১৯৯১ সালের গালফ যুদ্ধ, ১৯৯৯ সালে সার্বিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোর বিমান অভিযান এবং ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের প্রতিটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করেছে যে উন্নত প্রযুক্তি ও আকাশ শক্তি যুদ্ধের ধরন বদলে দিতে সক্ষম। কিন্তু বাস্তব ফলাফল সেই প্রত্যাশা পূরণ করেনি।
উদাহরণ হিসেবে, ১৯৯১ সালের ডেজার্ট স্টর্ম অভিযানে স্টেলথ বিমানের কার্যকারিতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি করা হয়েছিল। পরবর্তী এক গবেষণায় দেখা যায়, ঘোষিত সাফল্যের হার বাস্তবে অনেক কম ছিল। একইভাবে ১৯৯৯ সালে কসোভো যুদ্ধে ব্যাপক বোমা হামলার পরও সার্ব বাহিনীর উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়নি।
২০০৩ সালের ‘শক অ্যান্ড অ’ অভিযানে দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা করা হলেও শেষ পর্যন্ত স্থলবাহিনী ছাড়া তা সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানব আচরণ অপরিবর্তিত থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সরকারি বিশ্লেষক উইনসলো হুইলার বলেন, বোমা হামলা প্রায়ই জনগণের মনোবল ভাঙার বদলে প্রতিরোধ ও ঐক্যকে আরও সুসংহত করে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির লন্ডনে বিমান হামলার কথা উল্লেখ করেন, যা বৃটিশ জনগণের প্রতিরোধকে দুর্বল না করে বরং শক্তিশালী করেছিল।
ভিয়েতনাম যুদ্ধেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে। মার্কিন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থাকে সহজ কৌশলে বিভ্রান্ত করে উত্তর ভিয়েতনাম তাদের সরবরাহ লাইন সচল রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
ইরানে চলমান অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র উন্নত প্রযুক্তি, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের কথাও বলছে। তবে প্রশ্ন উঠছে এগুলো কি অতীতের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারবে, নাকি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
সমালোচকদের মতে, আকাশ শক্তির মাধ্যমে দ্রুত ও সহজ বিজয়ের ধারণা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তবুও এই ধারণা রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে প্রভাবিত করে চলেছে।
ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে এক শতাব্দী পুরনো এই তত্ত্বের মোহে পড়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো আবারও একটি দীর্ঘ ও জটিল সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে।
(লেখক: আরাম রোস্টন। গার্ডিয়ানের মার্কিন প্রতিনিধি। তার মূল লেখার সংক্ষিপ্তসার।)
গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণ
আকাশপথে সহজ জয়ের ভ্রান্ত ধারণা কি যুক্তরাষ্ট্রকে আরেকটি যুদ্ধে টেনে নিচ্ছে?
মানবজমিন ডেস্ক
বিশ্বজমিন
২ মাস আগে
২৭ মার্চ (শুক্রবার), ২০২৬, ৯ঃ৩৪ (পূর্বাহ্ণ)
লিংক কপি হয়েছে!
ফন্ট সাইজ:
100%
