ঠাণ্ডা উপেক্ষা করে শুরু থেকে জেলার ৪টি আসনের ৫৫৪টি ভোটকেন্দ্রের অধিকাংশ কেন্দ্রে ভোটারের সরব উপস্থিতির দৃশ্য চোখে পড়ার মতো। কেন্দ্রের বাইরেও উৎসুক জনতার মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষণীয়। প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত চায়ের রাজধানী খ্যাত মৌলভীবাজার জেলায় দীর্ঘদিন পর ভোটের আমেজ ফিরেছে। ভোটকেন্দ্রের আশপাশ এলাকা উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে এমন দৃশ্য ছিলো অকল্পনীয়। ওই আমলে দিনের ভোট রাতে হওয়ায় ভোটারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অপেক্ষায় থাকলেও দেখা মিলতো না কাঙ্খিত ভোটারের। যারা ভোটকেন্দ্রে আসতেন তারাও থাকতেন উদ্বেগ উৎকন্ঠায়। বিরোধীদল ও মতের ভোটাররা হামলা-মামলা কিংবা গুম হওয়ার ভয়ে ভোটের আগে থেকেই থাকতেন এলাকাছাড়া। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর ভোটের পরিবেশ ফিরে আসায় ভোটাররা তাদের নাগরিক অধিকার ভোটপ্রদানে কেন্দ্রগুলোতে আসছেন। বেলা যত বাড়ছে, ততই ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভীড় বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিপুল উৎসাহে ভোট দিতে লম্বা লাইনে অপেক্ষা করছেন নারী, পুরুষ ও তরুণ ভোটাররা। নতুন দেশ গড়ায় প্রত্যাশায় নিজেদের ভোট প্রদানে তাদের সবার চোখে মুখে আনন্দের আভাস। ভোটের আগে দেশে পৌঁছেছেন অনেক প্রবাসী। দীর্ঘদিন পর প্রবাসীরা তাদের নিজ এলাকার ভোট কেন্দ্রগুলোতে ভোট প্রদানের আনন্দে উৎফুল্ল তারা। অনেক প্রবাসী জানান, হামলা-মামলার ভয়ে বিগত নির্বাচনগুলোতে তারা ভোট দেয়াতো দূরের কথা, দেশেও আসতে পারেননি। এবছর তারা দেশে এসেছেন, ভোট দিচ্ছেন, এমনকি প্রবাসীরাও পোষ্টাল ভোটের মাধ্যমে ভোটে অংশ নিচ্ছেন।
জেলা রিটার্নিং অফিসারে কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, এবারের ভোটে এই প্রথম প্রবাসী অধ্যুষিত এ জেলার ২৩ হাজার ৭৩৬ জন ভোটার পোস্টাল ভোটের জন্য রেজিষ্ট্রেশন করেন। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি পোস্টাল ভোট গত দু’দিন আগে এসে পৌঁছেছে। জেলার ৪টি সংসদীয় আসনে এ পর্যন্ত কোনও অনাকাঙ্খিত ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। জেলার হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে ধানের শীষের প্রার্থী এম. নাসের রহমান মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে নিজের ভোট প্রদান করেন। এসময় তিনি গণমাধ্যমকর্মীদেরকে তার বিজয়ের বিষয়ে শতভাগ আশাবাদী বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। ওই আসনে কাস্তে মার্কার প্রার্থী জহর লাল দত্ত ভোট শুরুর দিকে নিজ এলাকার ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। একই সময়ে দাড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল মান্নান ও ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা আহমদ বিলালও নিজ ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন এবং নিজেদের বিজয়ের বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের মৌলভীবাজার শহরের শাহ মোস্তফা কলেজ কেন্দ্রে (পুরুষ ও মহিলা) প্রিজাইডিং অফিসার মো. হুমায়ুন কবির ও মো. খালেদ হোসেন জানান, তাদের কেন্দ্রে ৩১৬৭ মহিলা ও ৩০৫২ পুরুষ ভোটের মধ্যে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে প্রায় ৫শতাধিক ভোট কাস্ট হয়েছে।
তবে এই কেন্দ্রের ভোটাররা ভোটার তালিকায় এলাকানুযায়ী নাম না পেয়ে বিড়ম্বনা পড়েছেন। অনেককে ভোট না দিয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়।
হাফিজা খাতুন উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. খালেকুজ্জামান জানান, এই কেন্দ্রের মোট ভোটার ৩৯৯১ জন। সকাল ৯টার দিকে ভোট কাস্ট হয়েছে শতাধিক। মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম ও মো. ফররুখ হাসান খান জানান, এই কেন্দ্রে মোট ভোটার ২১৭৭। এরমধ্যে মহিলা ভোটার ১০৯৯ জন। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ভোট কাস্ট হয়েছে প্রায় দেড় শতাধিক। জেলার ৪টি আসনের অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রের ভোটার উপস্থিত চোখে পড়ার মতো- এমন তথ্য জানান আমাদের উপজেলা প্রতিনিধিরা।
জেলা নির্বাচন কার্যালয় সুত্রে জানা যায়, জেলা ৪টি আসনে মোট প্রার্থী ২৪ জন। মোট ভোটার ১৬ লাখ ১৪ হাজার ৯৩৬ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৮ জন। নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে মাঠে রয়েছেন এক্রিকিউটিভ ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩৬ জন। বিজিবির স্ট্রাইকিং টিম ১৫টি, আনসার ব্যাটালিয়ন ১৫টি, পুলিশ ১৪টি, র্যাবের ৮টি, সেনাবাহীনীর ২১টি। পুলিশের মোবাইল টিম ৫৩টি। মোট ভোট কক্ষের সংখ্যা ৩১০৫টি। প্রতিটি ভোট কেন্দ্র সিসি ক্যামরার আওতায় আনা হয়েছে। নির্দিষ্ট সদস্যদের থাকছে বডি-ওন ক্যামেরা। ১১ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জেলার ৪টি আসনে মোতায়েন রয়েছেন।
৫৫৪টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২৬৩ কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮০টি অতিঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৮৩টি কেন্দ্র সাধারণ ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
